Translate

Tuesday, 25 June 2013

দাম্পত্য জীবন, ভালবাসা / ড. মোহাম্মদ আমীন

দাম্পত্য জীবন, ভালবাসা

দাম্পত্য জীবন এক ধরণের সাবলেট। সাবলেট অসামর্থ্যের কষ্টকর প্রত্যাশা, নিষ্ঠুর বাস্তবতা। এটি অনিচ্ছাসত্ত্বেও ইচ্ছা করার মত একটি নষ্টকর হতাশা।
সাবলেট ইচ্ছে করে দেয় কিন্তু বাধ্যগত ইচ্ছা; যেখানে স্বতস্ফূর্ততা থাকে না। গ্রহীতার েেত্রও একই কথা। অন্যকোন উপায় থাকে না বলে মানুষ সাবলেট দেয়, সাবলেট নেয়। এটি দাতা-গ্রহীতা উভয়ের কষ্ট। বাসার আয়তন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম হওয়া সত্ত্বেও অনেকে সাবলেট দিয়ে থাকে। সাবলেট দিতে না পারলে ভাল হত, খুব ভাল হত। কিন্তু দিতে হয়। না দিয়ে উপায় থাকে না। বিয়েও ঠিক এমন। না করতে পারলে ভাল কিন্তু না করে পারে না। সবাই তো আর সব কিছু পারে না।
সাবলেটের মত কষ্ট হলেও দাম্পত্য জীবন না করে উপায় থাকে না। তাই মানুষ বিয়ে করে। বিয়ে এবং সাবলেটের মধ্যে কিছু পার্থক্যও আছে। সাবলেট একমুখী বিয়ে দ্বিমুখী। সাবলেটে দাতা-গ্রহীতার সম্পর্ক খুবই হালকা। অম্ল হলে যে কোন সময় সহজে বিচ্ছিন্ন হবার সুযোগ থাকে। বিয়েতে তা একটু কঠিন।
সুঃখের খোজে দুঃখে ঝাপিয়ে পড়াই হচ্ছে বিয়ে। কেউ কিন্তু শান্তির জন্য বিয়ে করে না। সুঃখের প্রত্যাশায় করে। কিন্তু সুঃখ পাওয়া যায় না। শান্তির তো কথায় নেই। যে দাম্পত্য জীবন সুখের সেটি দাম্পত্য জীবন নয়। ওয়েটিং রুম।
কলহ দাম্পত্য জীবনের সিম্বল। অশান্তি এর অলঙ্কার, বাক্যবান তার সঙ্গীত। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে কলহ না থাকলে বুঝতে হবে দম্পতি নয় তারা। লিভিং টুগেদার। অশান্তি না থাকলে বুঝতে হবে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে বোবা এবং অন্ধ। যে পুরুষ স্ত্রীর বাক্যবানে জর্জরিত হয় না ধরে নিতে হবে তার ঘরে বউ নেই, বউরূপী একজন দাসি আছে।
সংসার সৃষ্টির বিভোর কল্পনা দম্পতির উদগ্রীবতা। কিন্তু হায়, সংসারে ঢুকে মানুষ বুঝতে পারে এটি স্রেফ মরীচীকা- ঐশ্বর্য্যময় জাহান্নাম। কষ্টকর হাসির লুকানো যন্ত্রণায় দাম্পত্য জীবন অহর্নিশ উভয়কে ভোগায়। মানুষ এত কিছু আবিষ্কার করল কিন্তু প্রশান্তিময় দাম্পত্য জীবন উপভোগের কৌশলটা এখনও আবিষ্কার করতে পারল না।
সংসারের মত এত আকর্ষণীয় অসুন্দর, এত মোহময় বিতৃষ্ণা এবং এত প্রয়োজনীয় ব্যস্ততা আর কিছু নেই। তাই জ্ঞানীর সংসারকে নন্দিত নরক বলে থাকেন।
স্বামী-স্ত্রী নিয়ে দাম্পত্য জীবন আবর্তিত। দুজনের মধ্যে বিশ্বাস থাকা চাই,
অসুন্দর জিনিস সবসময় বিকর্ষক হতে পারে তবে অপ্রয়োজনীয় জিনিস সবসময় ফেলনা নয়, বরং প্রয়োজনের চেয়েও ঢের। অনেক প্রয়োজনীয় জিনিসও অনেক সময় খুব কষ্টের হয়ে দাড়ায়। কলমের কালি কাপড়ে পড়লে কারও ভাল লাগে না। প্রচণ্ড খারাপ হয়ে যায় মন। কালি কলমের মল এবং অবাঞ্চিত বমি। মল ও বমি দুটো যতই অস্পৃশ্য হোক, জৈব সারের উৎস, উর্বরতার ত্রে। কলম মলের উদর। লেখা পরিশীলিত প্রতারণা। যে লেখা যত পরিশীলিত সে লেখা তত সুচালো প্রতারণা। তাই মানুষ যত পড়ে তত আলোর প্রত্যাশায় রিডিং স্বপ্নের সাদা আলোয় ডুবে যায়। যে পড়ে না বিশ্বাসই তার যথেষ্ট। বিশ্বাস যার যথেষ্ট, সে পাশবিক।
কৃশকায় লোকটি অনেক কষ্টে রাজার ডানদিকে এসে দাঁড়ায়। রাজা এবার নিশ্চিত, লোকটি বউকে ভয় পায় না। একজন হলেও অন্তত আছে। রাজা বড় বাঁচা বেঁচে যান। গত রাতে বউ বলেছে- বউকে ভয় পায় না এমন পুরুষ তার রাজ্যে নেই। চ্যালেজ্ঞ করেছিলেন রাজা রাণীর সাথে।
রাজা আপ্লুত। দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরেন কৃষকায় লোকটিকে।
আমি আপনাকে আমার সাম্রাজ্যের প্রধান সেনাপতি বানাব। আমার সেনাপতিও বামদিকে। তুমি তার চেয়ে সাহসী। এমন সাহসী লোকই আমার রাজ্যের সেনাপতি হবার একমাত্র যোগ্যতা রাখে।
সম্রাট কৃশকায় লোকটির হাত ধরে বললেন: বীর বলুন,কীভাবে এত পাতলা শরীরে বউকে ভয় না পেয়ে চলা সম্ভব? আপনি কীভাবে এমন দুর্লভ মতা অর্জন করলেন? সত্যি আপনি কী বউকে ভয় পান না?
জ্বী না।
তাহলে ডানে দাঁড়ালে কেন? তোমাকে তো মরতে হবে।
রাজার সম্বোধন আপনি হতে তুমিতে নেমে আসে। বীরভোগ্যা বসুন্ধরা।
বল, জল্লাদ প্রস্তুত হও।
কৃশকায় কাঁপছে: বউয়ের জন্য আমার মরতে হচ্ছে।
কেন?
আসার সময় বউ ডানে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিল। হুজুর, বউকে বলেছিলাম, বামে দাঁড়াব। কিন্তু বউ ধমক দিয়ে বলেছে; মিনসের পুত যা বলছি তা-ই করবে। আমি বলেছিলাম, তাহলে জল্লাদ আমাকে কতল করে ফেলবে। বউ রেগেমেগে ধাক্কা দেয়: নচ্চার, যা বলি তাই শুন। বামদিক লোকারন্য থাকবে। ডানে কেউ দাঁড়াবে না। বামে অসংখ্য লোকের ভীড়ে তোমার অসুবিধা হতে পারে।
আমি বলেছিলাম: কিন্তু ডানে দাঁড়ালে স্রমাট মেরে ফেলবে।
বউ প্রচণ্ড ধমক দিয়ে বলেছিল: আমার কথার যেন নড়চড় না হয়। হুজুর এ জন্য আমি বউয়ের ভয়ে ডানে দাঁড়িয়েছি। বউয়ের ভয় মৃত্যু ভয়ের চেয়েও ভীতকর।
বউ পছন্দ করে না এমন কাজ কেউ সাধারণত বউয়ের সামনে করে না, করতে পারে না। কিন্তু বউয়ের অগোচরে করে থাকে অনেকে অনেক কিছু। বউ তা জানে না। স্বামীধন ভাবে বউ কী বোকা! কিচ্ছু জানছে না।
কিন্তু বউও যে স্বামীর অবর্তমানে তার চেয়েও খারাপ কিছু করতে পারে তা বোক হদ্দ স্বামী ঘুণারেও ভাবে না। ভাবে তার বউয়ের সীতা। তাই বউ ভাবে স্বামীরা আসলেই হাবা, গর্দভের গর্দভ। স্বামী কত গর্দভ তা রাস্তায় স্বামীর হাতে লাগেজ আর গতরে বাচ্চা দুটোর ভারে ন্যুজ্ব দেখে অনুমান করা যায়।
বউ আর বস উভয়ে সর্বোত্তম প্রত্যয়, আদর্শের কাণ্ডারি, কল্যাণের সাগর।
যা কিছু উত্তম, যা কিছু মানবীয়, যা কিছু যৌক্তিক তা বউ এবং বস। বউ আর বসের সবকিছু অসাধারণ তুলনীহীন এবং গর্বিত প্রকাশ। এর কোন তুলনা নেই।
তাই বউ এবং বসের কাছে সব সময় ছোট থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।

আহমদ ছফার প্রবন্ধ / ড. মোহাম্মদ আমীন


আহমদ ছফার প্রবন্ধ

আহমদ ছফা নামটির মধ্যেই প্রাবন্ধিক অনুভূতির শৈল্পিক-কাকলী, যুক্তির উৎকর্ষ, পরিশীলিত চেতনা, ঋদ্ধিক মননশীলতা, আতœপোলব্ধিমুগ্ধ সার্বজনীনতা, পরিব্যাপ্তিময় সৌন্দর্য্যরে নিবিড় চেতনা এবং মুক্তবুদ্ধি উজ্জীবিত সাহসী অনুরণন লালিত্য আগ্রহে ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে। তাঁর প্রবন্ধ সাহসিকতার অনল, তত্ত্ব-তথ্যের নিপূণ সমন্বয় এবং মুক্তবুদ্ধির তৃপ্তিকর পুষ্টি। প্রতিটি কথা বাস্তবতার প্রমুগ্ধ গাঁথুনিতে প্রকৃতির মত নিপাট, ইতিহাসের মত নিখাদ। আহমদ ছফার প্রবন্ধ পাঠকমহলে আলাদা মর্যাদায় গৃহিত, বিশ্লেষক মহলে ভিন্নমাত্রায় স্বীকৃত। গবেষকদের কাছে তার প্রবন্ধ তুলনাহীন গ্রহণযোগ্যতা নন্দিত। সাহসিকতা, স্পষ্টবাদিতা এবং লুকোচুরিহীনতার জন্য তার প্রবন্ধ যেমন আলোচিত তেমনি সমালোচিত। বস্তুত: এটাই প্রবন্ধের সার্থকতা। এখানে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ বিজ্ঞান, রাষ্ট্রাচার, সমালোচনা, জীবন, মুল্যবোধ, ধর্ম, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, দর্শন, নান্দনিকতা, শিক্ষা ব্যবস্থা, গ্রাম, নগর, বুদ্ধিজীবী, সাধারণ মানুষ, চোরাচালান, সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং পররাষ্ট্র ব্যবস্থাপনাসহ প্রাত্যাহিক জীবনের আরও অনেক বিষয় প্রকৃষ্ট কৌশলে হৃদয়গ্রাহী ভাষা আর মনকাড়া যুক্তিতে বিধৃত। নিঃসন্দেহে আহমদ ছফা একজন স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রাবন্ধিক। রচনাশৈলী আর প্রাবন্ধিক উপাদানের স্বয়ংস্পূর্ণতাময় তথ্যের জন্য আহমদ ছফা প্রথম থেকে বোদ্ধা মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। উপমহাদেশের বাঙালি মননশীলতার সর্ব বিষয়কে পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করার জন্য আহমদ ছফার বাঙালি মুসলমানের মন প্রবন্ধটির বিকল্প এখনও দেখা যায় না। এ একটা প্রবন্ধ লিখেও যদি আহমদ ছফা থেমে থাকতেন, তবু তিনি বাংলা সাহিত্যে প্রাববিন্ধক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতেন।

আহমদ ছফার বিখ্যাত কয়েকটি প্রবন্ধের মধ্যে বাঙালি মুসলমানের মন, মানিক বন্দোপাধ্যায়ের  একটি চরিত্র, শিক্ষার দর্শন, রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃতি সাধনা, বার্টান্ড রাসেল, ভবিষ্যতের ভাবনা, বাংলার ইতিহাস প্রসঙ্গে, একুশে ফেব্রুয়ারি ঊনিশ শ’ বাহাত্তর, বাংলার চিত্র-ঐতিহ্য: সুলতানের সাধনা, বাংলাভাষা: রাজনীতির আলোকে, বাংলার সাহিত্যাদর্শ, ভাষাবিষয়ক চিন্তাভাবনা, জীবনান্দ দাশ: তাঁর কাব্যের লোকজ উপাদান: সাম্প্রতিক নিরিখ, ফারাক্কা ষড়যন্ত্রের নানান মাত্রা, মাওলানা ভাসানী: ফারাক্কা গৃহদাহের রাজনীতি, মাদ্রাসা শিক্ষার কথা, অমৃতভা- মাইজভা-ার, গ্রামের কথা, আনুষ্ঠানিক শিশুশিক্ষা প্রসঙ্গে, তাহলে এই হল গ্রন্থমেলা, একটি খোলা নালিশ, সাহিত্যের সুসমাচার, স্মৃতির দীয়া, কেন আমি বই মেলায় যাব, বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা, পাবর্ত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রক্রিয়া কতিপয় বিবেচনা, পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিচুক্তি: সাম্প্রতিক পরিস্থিতি রেফারেন্ডামে দেওয়া হউক, শান্তিচুক্তি যেভাবে দেখি, আওয়ামীলীগ বুদ্ধিজীবীদের একাংশ, ভারতে বিজিপির উত্থান এবং তারপর, ছাতা মাথায় নির্মল সেন আমি তাকে ভোট দেব, চোরাচালান, উত্তরবঙ্গ: সীমান্ত অর্থনীতি, সালমান হায়দারের সাংবাদিক সম্মেলন প্রসঙ্গ: কতিপয় বক্তব্য, আমলারা নিজেরা একটি পার্টি, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং ফারাক্কার রাজনৈতিক প্রেক্ষিত, বিদ্যুৎ কেনার আগে পাঁচবার ভাবতে হবে, আসামের দিকে তাকাতে হবে, কবি শামসুর রাহমান আমার সম্পর্কে যা বলেন এবং বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এ সকল প্রবন্ধের প্রাঞ্জল বর্ণনার যৌক্তিক স্বকীয়তার সাবলীল বুদ্ধিমত্তায় অনন্য। প্রবন্ধগুলো বাংলা সাহিত্যের  অনবদ্য সংযোজন। বিষয় ও বর্ণনায় মনোমুগ্ধকর প্রবন্ধসমূহের জন্য বাঙালি জাতি আহমদ তাঁর কাছে চিরঋণী।

আহমদ ছফার প্রবন্ধ পাঠ করলে পাঠক মাত্রই আবেশঘণ অনুভূতির তীব্র প্রশ্নে জেগে উঠেন। হৃদয়মন আত্ম-উপলব্ধির নব চেতনায় মগ্ন হয়ে পড়ে মধুর আলেখ্যে। স্বল্প পরিসরে বিশাল বিষয়কে পরিপূর্ণ অনুধাবনময়তায় প্রকাশ করার ক্ষমতা বিবেচনায় আহমদ ছফা শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, বিশ্ব সাহিত্যেরও একজন শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিক। শুধু প্রবন্ধ কেন, উপন্যাস, কবিতা, ছোটগল্প ও রম্য রচনাতেও তিনি সিদ্ধহস্ত। যদ্যপি আমার গুরু, ওঙ্কার, সূর্য তুমি সাথী প্রভৃতি উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে নুতনমাত্রা সৃষ্টি করেছে। বাংলা সাহিত্যে কয়েকজন শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিকের নাম বললেও নিরপেক্ষ বিচারে আহমদ ছফার নাম এসে যায়। তবে দশটি প্রবন্ধের নাম বললে দুটির মালিকানা এসে যায় আহমদ ছফার কাছে- একটি ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ এবং অন্যটি - বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস। তার প্রবন্ধ যেন ষড়ঋতুর মোহনা। সোনালী সূচনার অবগাহনে ক্রমান্বয়ে আকর্ষণীয় সঞ্চরণের বিহবল পরিক্রমায় যেন তৃপ্তিময় সমাপ্তি। এ পরিচ্ছেদে বর্ণিত প্রবন্ধদ্বয় কেউ ভালভাবে অনুধাবন করতে পারলে তার কাছে বাঙালি, বাঙালি মুসলমান আর বাঙলার সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে তেমন কিছু অজানা থাকার কথা নয়। এমন যৌক্তিক ও প্রাণবন্ত প্রবন্ধ বাংলা সাহিত্যে আর নেই। স্বল্প পরিসরের তিনি বাঙালি মুসলমানের মন, বুদ্ধিজীবীগণের মানসিকতাকে আর্থসামাজিক ব্যবস্থার বিদ্যমান পরিপূরকে যে নিপূণতার সাথে তুলে ধরেছেন তা সত্যি বিস্ময়কর। আহমদ ছফা ছাড়া অন্য কারও পক্ষে তা সহ¯্রাধিক পৃষ্ঠার গ্রন্থেও প্রকাশ করা সম্ভব হতো না।

প্রবন্ধ রসকসহীন তত্ত্ব-তথ্যের ভয়ঙ্কর শব্দবন; বিচরণ কষ্টসাধ্য, আহরণ বিরক্তিকর- এমন অভিযোগ প্রায় শুনা যায়। আহমদ ছফার প্রবন্ধ এরূপ অভিযোগ হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। তাঁর প্রবন্ধ আকর্ষণের সজীবতা; তথ্যে আগ্রহ, তত্ত্বে সারল্য, বিবর্ণনে সততা, প্রকাশে উদ্দীপনা, পরিবেশনায় মুক্তবুদ্ধির অজেয় বিজয় এবং উপসংহারে প্রাপ্তির আনন্দ পাঠককে অন্য জগতে নিয়ে যায়। সব মিলিয়ে প্রতিটি প্রবন্ধ প্রাণকাড়া শব্দবাগান। বিচরণ মোহনীয়, প্রাপ্তির আনন্দ, সুখকর উপভোগের নান্দনিক বিমূর্ততা। বিষয় আকর্ষণীয় হলেও উপস্থাপনের কারণে অনেকের প্রবন্ধ পঠন আর অনুধাবনে অনাগ্রহ সৃষ্টি হয়। আহমদ ছফার চয়ন কৌশল তুলনাহীন। যেখানে যতটুক প্রয়োজন ঠিক ততটুক রস, ততটুক তথ্য, ততটুক যুক্তি এবং ততটুক বর্ণনা। কোথাও বিন্দুমাত্র অতিরঞ্জন নেই। নিখাদ রমণীয়। যা কোনরূপ প্রয়াস ব্যতিরেকে প্রকৃতির মত নিবিড় অবহেলার শ্যামল আলেখ্যে ব্যাপ্ত। তাঁর লেখা প্রকৃতিময় সহজাত প্রবৃত্তিতে পাঠককে নিবিড় আগ্রহে টেনে রাখে। রান্না ও পরিবেশনার কারণে অনেক ভাল খাদ্যও অখাদ্য হয়ে উঠে। আবার রন্ধন ও পরিবেশনার গুণে সাধারণ মানের খাবারও  হয়ে উঠে অসাধারণ। পরিবেশনার অপূর্ব কৌশলের কারণে  যে কোন সাধারণ বিষয়ও আহমদ ছফার প্রবন্ধে অসাধারণ হয়ে উঠে। জ্ঞান, গরিমা, বুদ্ধি, সাহস, বিচক্ষণ পরিবেশনা, ছন্দময় আবহ-অনুরাগ, তীক্ষè-সময়বোধ, প্রগাঢ় ঐতিহাসিকতা, নিষ্ঠাময় বাস্তবতার কোড়ক এবং সৃজনশীল তুলিকাব্যের নির্ভয় পদচারণা আহমদ ছফার প্রবন্ধগুলোকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধের সারিতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

বাংলা সাহিত্যে এ পর্যন্ত যত প্রাবন্ধিক, লেখক এবং সাহিত্যিক জন্মগ্রহণ করেছেন তম্মধ্যে আহমদ ছফাই সবচেয়ে সাহসী, বুদ্ধিমান, স্বতস্ফূর্ত, নির্লোভ, ঋদ্ধ, কুশলী, বহুমুখী এবং তেজময়। নির্লোভ মননশীলতা এবং সত্যসমৃদ্ধ স্পষ্টবাদিতার জন্য তাঁকে ভয় পেতেন না এমন কোন বাঙালি ছিলেন না; এমনকি তাঁর শিক্ষকগণ পর্যন্ত। তাঁর প্রবন্ধে গবেষণার ঐকান্তিকতা, ইতিহাসের নিবিড়তা, কাব্যের প্রাণবন্ততা, উপন্যাসের বিমূর্ততা আর নাটকের পরিণতি ত্রিকালদর্শীর মত চিরন্তন, সতত বর্তমান এবং সংগতকারণে সার্বজনীন। ধর্ম তাঁর কাছে ফেলনাও নয় আবার ধনকাতুরে সুখলোভী মানুষের মত আকর্ষণীয়ও নয়। আধুনিকতার বিনির্মাণে এর কোন ভূমিকা তাঁর চোখে পড়ে না। তিনি রাজনীতিকে ধর্মের উন্নত সংস্করণ মনে করেন। রাজনীতির মতই ধর্ম মানুষের তদকালীন প্রাত্যাহিক সমষ্টিগত প্রয়োজনয়তা মেটানোর স্বার্থে গৃহিত।

তবে তিনি ত্রিকালদর্শী। তার প্রবন্ধই এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ। একজন মানুষের একই সময়ে ত্রিকালদর্শী হওয়ার যে সকল উপাদান আবশ্যক সব কটি আহমদ ছফার ছিল। ত্রিকালদর্শীর প্রবন্ধ ত্রিকালেরই ছায়া। তাই তাঁর প্রবন্ধ কালজয়ী বাণী এবং বিদগ্ধ অনুসন্ধানের প্রশ্নময় কথকতা। বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে এখনও আহমদ ছফাকে টেক্কা দেয়ার মত কেউ জন্মায়নি। তাঁর প্রবন্ধগুলো বাংলা সাহিত্যের মর্যাদা, প্রবন্ধজগতের আকড়। মানুষের প্রাত্যাহিক জীবনে এমন কোন বিষয় নেই যা তাঁর প্রবন্ধের ছোঁয়ায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠেনি।বর্তমান প্রজন্মকে বাংলাদেশ, বাঙালি এবং বাঙালি সমাজ ও আর্থ-রাজনীতিক এবং সামাজিক বিবর্তন সম্পর্কে সত্যিকার অনুবোধে সৃজনশীল হয়ে উঠার অনুকূলে আহমদ ছফার এ প্রবন্ধ সংগ্রহ পাঠের বিকল্প আছে বলে মনে হয় না।

প্রবন্ধকে যদি শরীরের সাথে তুলনা করা হয় তাহলে আত্মজ্ঞান-নিবিড় প্রকৃষ্ট অনুসন্ধানের পক্ষপাতহীন যোজনা আহমদ ছফার প্রবন্ধের অবয়ব, নির্লোভ আভিজাত্যের সাহসী উচ্চারণ মাংশপেশী, দুরদর্শী চেতনার শালীন বাক্যবান তার শক্তি, জাগড়নময় অনুভবের প্রীতম প্রতীতি হৃদপি-, বাস্তবতার নিরিখে অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যতের মুক্তবুদ্ধিঘণ সমন্বয় মস্তিষ্ক এবং আকর্ষণীয় বাক্যের মন্দ্রিত প্রাঞ্জলতা তাঁর প্রবন্ধের সৌন্দর্য্য। এমন সৌকর্ষ্যময় বিকাশ আর হয় না। প্রবন্ধ সংগ্রহের প্রতিটি প্রবন্ধ বিষয়ভিত্তিক ঋদ্ধতার অনবদ্য ফসল। প্রতিটি প্রবন্ধের বর্ণনায় না গিয়ে একটি কথায় বলা যায়, আহমদ ছফা বাংলা সাহিত্যের আদর্শ প্রবন্ধের ভিত্তি। কেউ যদি কয়েক পৃষ্ঠার একটি প্রবন্ধ পড়ে কোন বিষয়ে নিবিড় জ্ঞান অর্জন করতে চান তাহলে তার জন্য সহজ ও বিচক্ষণ উপায় হচ্ছে আহমদ ছফার প্রবন্ধ পাঠ।





Tuesday, 2 April 2013

পদোন্নতি / ড. মোহাম্মদ আমীন

পদোন্নতি
ড. মোহাম্মদ আমীন
হামিদ সাহেবকে দেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান মুখলেস: আসসালামুআলাইকুম। কেমন আছেন স্যার।
হামিদ সাহেব চোখে হাসির রেখা টেনে মাথা দোলান: ভালো। তুমি কেমন আছো।
গদিআঁটা চেয়ারটা হামিদ সাহেবের দিকে এগিয়ে দিয়ে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মুখলেস বিনীত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। চকচকে পাদুকাদ্বয়ে গর্বিত মুখাবয়ব। সামনে দাঁড়ানো হামিদ সাহেবের একাংশ যোগ্যতা থাকলেও তিনি দশ বছর আগে ক্যাবিনেট সেক্রেটারি হতেন। পদ মানে পা; এ পদই সব, মস্তক অনর্থক, বোঝা বৈ কিছু নয়। পদের জোরে তিনি এখন সচিব। তাই পদোন্নতি, মানে পদের উন্নতি। মস্তক দিয়ে কিছু হয় না। নইলে হামিদ সাহেবের মতো মস্তকধারী এখনও উপসচিব কেনো?
কেনো মস্তকোন্নতি হয়নি?
পদভাগ্যের গর্বিত অহঙ্কারে আপ্লুত মুখলেস সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত কবুতরের মতো নিবিড় গভীরে কেঁপে উঠেন আনন্দে। পদোন্নতির মজাই আলাদা; চকচকে জুতো দিয়ে বাঁকা বিশ্রি পা দুটো ঢেকে রাখার মতো মধুর।
অনুষ্ঠান শুরু হয়নি।
অতিথিরা দর্শক সারিতে বসে। সচিব মুখলেস সাহেবের ব্যবহাওে উপসচিব হামিদ সাহেব খুশি হয়েছেন কিনা বুঝা যায় না। চোখের পাতা ধাবমান গিরগিটির লেজের চেয়ে দ্রুত নড়ছে। এটি খুশির লণ নয়, উপহাসের; কষ্টের নয়, নষ্টের। বাঘ বিড়ালের মতো, পণ্ডিত মুর্খের মতো কিংবা রাজা ভিুকের মতো আচরণ করলে চোখের পাতা এমন কাণ্ড ঘটায়।
আমি স্যার এখন স্বরাষ্ট্র সচিব, কয়েক মাস আগে জয়েন করলাম।
হামিদ: পত্রিকায় দেখেছি।
মুখলেশ: আপনার পোস্টিং কোথায় স্যার?
আমি তোমার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব। এ অনুষ্ঠানে তো বাবা অন্য মন্ত্রণালয়ের অফিসারদের ডাকা হয়নি। আন্দাজ দিয়ে হলেও বুঝা নেয়া উচিত, নাকি! তুমি ঠিক আগের মতই বোকা রয়ে গেলে। অথচ সচিব ঠিকই হয়ে গেছো।
আপনাকে তো স্যার মন্ত্রণালয়ে দেখিনি।
তুমি সচিব, আমি উপসচিব। বিরাট মন্ত্রণালয়, না ডাকলে তোমার-আমার দেখা হবার সুযোগ কই?
সচিবের আচরণে হলরুমের সবাই অবাক। পুলিশ সচিবের আচরণে পুলিশ অতিথিদের চোখ ছানাবড়া। এ কেমন সচিব, উপসচিবকে স্যার ডাকেন!
উপসচিব কখন সচিবের বড় হয়ে গেলেন?
নিজে নিজে প্রশ্ন করে আতঁকে উঠেন সিনিয়র সহকারী সচিব জব্বার। আট বছর আগে চাকরিতে ঢুকেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র, ইচ্ছা ছিল পুলিশ হবেন। হতে পারতো, মা-বাবার জন্য পারেননি। পরীার হলে ম্যাজিস্ট্রেটের ডিউটি-মতা দেখে পাড়াপড়শিরা সারাণ ম্যাজিস্ট্রেট বন্দনায় মেথে থাকতো। এ রোগ বাহিত হয় শিক পিতা শাহেদ আলীর মনে। প্রাইমারি স্কুলে ম্যাজিস্ট্রেট এলে উপজেলা বস পর্যন্ত তটস্থ হয়ে থাকতেন। তিনি দেখেছেন ম্যাজিস্ট্রেটের ইজ্জত, মতা এবং শানশওকত। জন্মের পর থেকে জব্বারকে ম্যাজিস্ট্রেট করার পণ। সাথে ভিড়েছেন মা। 
বিসিএস পরীার আবেদন পূরণ করার সময় পিতা শাহেদ আলী নিজে দাঁড়িয়ে প্রশাসন ক্যাডারকে প্রথম পছন্দে রাখতে ছেলেকে বাধ্য করেন। প্রতিবাদ করেছিলেন জব্বার।
বাবা, প্রশাসনের সে আগের দিন নেই।
প্রশাসন রাজকীয় ক্যাডার। সরকারের মাথা থেকে পা পর্যন্ত সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। হাতি মরলেও লাখ টাকা।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও যোগ দিয়েছেন প্রশাসন ক্যাডারে। ঢুকে বুঝতে পেরেছেন প্রশাসন রাজকীয় ক্যাডার নয়। ীয়মান ক্যাডার। এর ‘কীয়’ আছে; ‘রাজ’ খসে পড়েছে। পাশের বাড়ির মুন্সি মিয়ার ছেলে ইমরান ফরেন ক্যাডারে। জব্বারের দুই বছর জুনিয়র; সে এখন পরিচালক। জব্বার সহকারী পরিচালক। ফরেন ক্যাডারে গেলে জব্বার মহাপরিচালক থাকতো। মানে এ্যামবেসেডার। মাইজ পাড়ার সুমন পুলিশ সুপার। একটা জেলার মা-বাপ। সে ইমরানেরও জুনিয়র। শাহেদ আলী এখন কপাল চাপড়ায়।
শাহেদ আলী বাজারে গেলে সালাম পায় দশটি। ইমরান আর সুমনের বাবা পায় একশ করে দুশো। লজ্জায় মাথা হেট হয়ে যায়। যে দশটি সালাম পায় তাও শিক হিসেবে। ম্যাজিস্ট্রেটের বাপ হিসেবে নয়। ইমরান পাড়ার বিশজন লোককে বিদেশ নিয়েছে। সুমন ত্রিশ জন যুবককে পুলিশে ঢুকিয়েছে। জব্বার কাউকে চাকরি দেয়া দূরে থাক নিজের ছোট বোনের স্বামী রমজানের বদলিটা পর্যন্ত ঠেকাতে পারেনি। সংসার ভেঙ্গে যাবার উপক্রম হয়েছিলো। ব্যর্থ জব্বারকে নিয়ে বোনের কাছে কেটেছে: কেমন ভাই তোমার? বালকাটা ম্যাজিস্ট্রেট; বদলিটা পর্যন্ত টেকাতে পারলে না?
বদলিটা দেখতেন একই ক্যাডারের সিনিয়র জাহাঙ্গীর সাহেব। তার কাছে পাঠিয়েছিলেন রমজানকে। কাজ তো করেননি বরং অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছেন। রমজান অপমানের শোধ নিয়েছে স্ত্রীকে পিঠিয়ে। বোন বাড়ি এসে জব্বারের পায়ে ধরে কেঁদেকেটে একাকার: একটু দেখিয়ে দেন আপনার মতা।
অসহায় জব্বার সুমনের শরণাপন্ন হয়। পুলিশের এসপি, ডাণ্ডার জোর; বলার সাথে সাথে ছোট রমজানের বদলি বাতিল করে দিয়েছিলেন প্রশাসন ক্যাডারের জব্বারের এক ব্যাচ আগের কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন।
আমি তোমার খুব তি করেছি।
জব্বার: পুলিশে গেলে আমি এখন ডিজি, বিভাগের মা-বাপ। এসপি-ডিসি আমার কথায় উঠতো-বসতো। সত্যি, বাবা তুমি আমার বড় তি করে ফেলেছো। গ্রাম্য মধ্যবিত্ত মানসিকতার কারণে এমনটি হয়েছে।
ডিসি বড় না এসপি বড়?
একই পাবলিক ডিসির সামনে বসে ওসিকে স্যার এবং ডিসিকে ডাকে ভাই। নিজের চোখে দেখেছি, নিজের কানে শুনেছি। ম্যাজিস্ট্রেসি চলে যাবার পর ডিসির এব্রিভিয়েশনই চেইঞ্জ হয়ে গেছে বাবা। ডিসি মানে ডেইজ সেলিব্রেটর।
মুখলেস: স্যার, আগামীকাল আমার সাথে দেখা করবেন।
হামিদ: তুমি বসো। আমি পাশের চেয়ারে বসি।
না স্যার, আপনি আমার চেয়ারে বসুন।
মুখলেস হামিদ সাহেবের সহকারী সচিব ছিলেন। পটুয়াখালীতে ডিসি থাকাকালীন মুখলেস ছিলেন হামিদ সাহেবের একান্ত সচিব। এখন সে সচিব; লৌকিক আঘাতের অলৌকিক থাপ্পড়ে ‘একান্ত’ শব্দটা খসে পড়েছে। সারা জীবন দতার সাথে চাকরি করেছেন, জাস্ট অবিডিয়েন্ট সার্ভেন্টের মতো। তারপরও তিনি উপসচিব। মাত্র সাত বছর, সাত বছরের মধ্যে মুখলেস সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে সচিব। হামিদ অনড় দ্বীপ, এখনও উপসচিব।
মুখলেস:ভাবী কেমন আছেন স্যার? বাচ্চারা?
মুখলেসের কথায় হামিদ সাহেবের কান নেই। তিনি প্রতিবেশী জাফরের কথা ভাবছেন। তার কয়েক ব্যাচ জুনিয়র। জাফরভাবী সংসার ছেড়ে বাপের বাড়ি। এর কয়েকদিন আগে পদোন্নতি হয়েছে। জাফর পিএসসির মেধায় ব্যাচের সাত নম্বর। তার প্রমোশন হয়নি কিন্তু চারশ ঊনচল্লিশ নম্বরের মোকাব্বির দিব্যি আরামে পদোন্নতি পেয়ে যুগ্মসচিব।
পদোন্নতির পরদিন জাফরের বউ বাচ্চাদের স্কুল গেটে গাড়ি থেকে নামতে ডাক দেন উৎপল বৌদি: আমার সাহেব যুগ্নসচিব হয়েছেন। আপনার সাহেব নাকি হয়নি? আহারে বেচারা, কত কষ্ট লাগছে। আচ্ছা ভাবী আপনি তো বলতেন, আপনার সাহেব অনেস্ট, অনেক লেখাপড়া জানে, তো প্রমোশনটা হলো না কেন? সরকার দিলো না কেনো? কাজটা সরকার ভালো করেননি। অবশ্য যোগ্যতা না থাকলে সরকার প্রমোশনই বা দেবেন কীভাবে? তাই না ভাবী! মন খারাপ করবেন না, ঈশ্বর যা করেন ভালোর জন্যই করেন।
বৌদির কথা শেষ হবার আগে দৌড়ে আসেন নিয়ন। জাফরের ছেলে কালামের বন্ধু। একটা ফুল কালামের হাতে দিতে দিতে বললেন: শুনেছি, তোর বাবা নাকি প্রমোশন পায়নি। আমার বাবা পেয়েছে। মা বলেছেন, যারা ভালো তারাই প্রমোশন পায়। ফুল নেয়, বাবাকে সেলিব্রেট করছি।
চৌদ্দ বছরের বাচ্চার মনটা বাবার সংবাদটা শোনার পর থেকে খারাপ ছিল। নিয়ন এবং আন্টির কথা শুনে রীতিমত কেঁদে দেয়: মা, আব্বুকে প্রমোশনটা এুণি নিয়ে নিতে বলো। নইলে আমি আর স্কুলে আসবো না।
বাচ্চা রেখে বাসায় এসে ঝাঁপিয়ে পড়েন পদোন্নতি বঞ্চিত জাফরের উপর: প্রমোশন পেলে না কেনো? এমন কী দুই নম্বরি তুমি করেছো?
আমি জানি না।
নিশ্চয় তুমি জানো। আমি আগে থেকে জানতাম তলে তলে তুমি আস্ত শয়তান।
বঞ্চনার কষ্টের সাথে স্ত্রীর কথায় হিতাহিত বোধ হারিয়ে ফেলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে তুমুলে উঠে দুজন। মুখোমুখি হতে হাতাহাতি- রক্তারক্তি। তারপর আসেন শ্বশুড়। তিনি মেয়েকে নিয়ে সোজা নিজের বাড়ি: জাফর আমি জানতাম না, তুমি একজন পশু, অপদার্থ; অযোগ্য এবং অথর্ব। জানলে আমার মেয়ে তোমার হাতে দিতাম না। প্রমোশন না পেলে আমার মেয়ে আর আসবে না। পদোন্নতি নিয়ে জানাবে। আমি নিয়ে আসবো।
স্যার, পটুয়াখালীর কথা মনে আছে? ভাবী আমাকে ভাইয়ের মত স্নেহ করতেন। তাই তাকে আপা ডাকতাম। মুখলেসের কথায় সম্বিৎ আসে হামিদ সাহেবের।
মুখলেস?
জ্বী স্যার?
তুমি কী সত্যি জানতে না আমি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব?
জয়েন্ট সেক্রেটারি হবার পর আপনার পদধুলি নিতে গিয়েছিলাম। তখন আপনি ভূমি মন্ত্রণালয়ে। এরপর নানা ব্যস্ততায় আর পিছনে থাকাতে পারিনি। পটুয়াখালী থাকার সময় আপনি আমার যে উপকার করেছেন তা কোনদিন ভুলবো না।
মুখলেসের শ্বশুড় ছিলেন ওসি। কথাবর্তায় পুলিশের চেয়েও জাঁদরেল। চুণ থেকে পান খসলে আগ্নেয়গিরি। ধাক্কা দিয়ে মুখলেসকে বাসা থেকে বের করে দিতেন। অনেক বার সার্কিট হাউজে থেকেছেন। সবাই জানত তার বউয়ের আচরণ। অসহ্য হয়ে একদিন বউয়ের গালে চড় মেরে দেয়। আর যায় কোথা। বউ ফোন করে বাপকে, বাপ এসে সোজা থানায় এবং মামলা। ওসির মেয়ে বাদি, আসামি ম্যাজিস্ট্রেট। পুলিশ সক্রিয় হয়ে উঠে। যৌতুকের সাথে নারী নির্যাতন। অসহায় মুখলেস রাতে গিয়ে হামিদ সাহেবকে ঘটনা জানান। এসপি সাহেবের সাথে আলোচনা করে স্বামী-স্ত্রী উভয়কে ডেকে মীমাংসা করে দেয়। হামিদ সাহেব উদ্যোগ না নিলে এরেস্ট হয়ে যেতেন মুখলেস। জলে ভেসে যেতো ভবিষ্য সচিব।
সত্যি স্যার, আমি জানতাম না; মুখলেসের কথায় বর্তমানে চলে আসেন হামিদ সাহেব।
একজন সচিব যদি তার মন্ত্রণালয়ে কয়জন অফিসার আছেন না জানেন তো তার সচিব হবার যোগ্যতা কোথায়? এত বড় মন্ত্রণালয় কীভাবে চালাবে?
যোগদানের পরই তো স্যার বিদেশ আর বিদেশ। কত কাজ, কত গুরুত্বপূর্ণ। ছোটখাট বিষয় মনে রেখে লাভ কী?
যে অফিসার ছোটখাট বিষয় মনে রাখতে পারে না সে কীভাবে বড় বিষয়গুলো মনে রাখবে? যে প্যারা মুখস্থ করতে হিমশিম খায় সে কীভাবে রচনা মুখস্ত করবে?
যাই বলুন স্যার, আপনার জন্য আমার বড় কষ্ট হয়। আপনার কথা মনে পড়লে সার রাত ঘুমোতে পারি না। সততা, দতা, জ্ঞান, বিদ্যা- কী ছিল না আপনার! তারপরও পদোন্নতি হলো না। আমি স্যার আগামী এসএসবির সভায় আপনার কথাটা তুলে ধরবো। বলবো, আপনার পদোন্নতি না হলে আমারটা যেন কেড়ে নেয়।
হামিদ: ভাবী কী তোমাকে আগের মতো এখনও বাসার বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখে?
ভীষণ লজ্জায় মুখটা কাদামাখা।
কচুরিপানার মত বিদঘুটে করে বললেন: জ্বী না। সচিব হবার পর এমন আর করে না। সারাদিন গাড়ি-বাড়ি আর সভা-সমিতি নিয়ে ব্যস্ত থাকে। বাসায় আসার সময় পায় না। আপা কেমন আছেন স্যার? তিনি কী আগের মতন আপনাকে ভালোবাসেন?
তুমি সচিব হবার পর সে আমাকে ঘরে ঢুকতে দেয় না। আমি অথর্ব, অযোগ্য।
কে বললো?
তোমার আপা। নইলে পাঁচ বার সুপারসিটেড হলাম কেনো? বলো বুড়ো বয়সে এখন কোথায় যাই?
হামিদ সাহেবের কথা শেষ হবার আগে মাইকে ঘোষণা আসে: জনাব মুখলেসুর রহমান, সিনিয়র সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মহোদয়কে প্রধান অতিথির আসন গ্রহণ করার জন্য সবিনয় অনুরোধ করছি।
সচিব থেকে সিনিয়র সচিব!
জব্বার: জ্বী স্যার, এ মাত্র জিও হয়েছে।

Wednesday, 16 January 2013

একুশ গর্দভের নীলদর্পণ

একুশ গর্দভের নীলদর্পণ

একুশ গর্দভের নীলদর্পণ
নিয়োগ পরীক্ষা শেষ। এবার উত্তরপত্র যাছাইয়ের পালা।
একুশ জন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা উত্তরপত্র নীরিায় আমন্ত্রিত। সবাই উচ্চ শিতি, বিসিএস; অনেক আট-ঘাট পোড়া। জ্যাক অব অল ট্রেড্‌স, মাস্টার অব নান; বাট এভরিথিং ক্যান ডান।
পরীার সার্বিক দায়িত্বে জনাব আবু তাকের, কমিশনার। অনেক কমিশনার আছেন, পুলিশ কমিশনার, কাস্টম কমিশনার, বিভাগীয় কমিশনার, সিটি কর্পোরেশনের কমিশনার; তবে গল্পের কমিশনার কিন্তু সিটি কর্পোরেশনের কমিশনার নন। বড় অফিসার। নিজেই প্রশ্ন-পত্র করেছেন, কাক-পীও জানতে পারেন নি। ঠিক যেমনটি হওয়া দরকার। বিসিএস পরীার প্রশ্নপত্রও লিক হয় কিন্তু তাকের সাহেবের হাত লিকহীন।
উত্তরপত্র সামনে নিয়ে সবাই কমিশনার সাহেবের অপোয়।
অপোর পালা শেষ হওয়ার আগে তিনি কে ঢুকেন। মুখে এক সমুদ্র অহঙ্কার, অহঙ্কারের বন্যা, চোখে গর্বের ফালি ফালি মেঘ। প্রাইম মিনিস্টারের বিশেষ পেয়ারের লোক।
সবাই দাঁড়িয়ে। তিনি নির্বিকার, চারিদিকে চোখ বুলিয়ে হাত নাড়েন। তার মানে- বসে পড়ো তোমরা, আমি বসব না।
তিনি দাঁড়িয়ে শুরু করেন ইনস্ট্রাকশান: অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে প্রশ্ন-পত্রটা করেছি, এঙ্ট্রা অর্ডিনারি। দুদিন দু রাত ঘুমোয় নি, ঘুমোতে পারি নি। তোমরা হলে দু মাস ঘুমোতে পারতে না। যাক, সে কথা, মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত। শুধু তাই নয়, প্রশ্নের চেয়ে আরও বেশি সতর্কতায় প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর লেখা হয়েছে। আমি আনসার স্ক্রিপ্টও সাথে নিয়ে এসেছি। তোমাদের দেব। আনসার স্ক্রিপ্টে প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেয়া আছে। সে মতে যাছাই করো, উল্টো-পাল্টা করো না। আনসার ছাড়া তোমরা উত্তরপত্র যাছাই করতে পারবে না বলে আটঘাট বেঁধে আসতে হয়েছে। আমি বিসিএস অফিসারদের দৌড় জানি, এক লাইনে চৌদ্দটি ভুল করে বসে। লেখা-পড়া তো গোল্লায় গেছে। সিএসপি পরীক্ষা দিলে বুঝতে কত রসে কত গুড়, কত চুল কাটে  ক্ষুর।
সবাই ুব্ধ নয়নে শুনছিলেন। সিএসপি-দের এ একটা বড় দোষ। তারা ছাড়া আর কেউ কিছু জানেন না।
আজাদের ভাষায় সিএসপি মিনস- কন্ট্রাকচুয়্যাল সার্ভিস বাই পাম্প। মুনীর চৌধুরী বলেন: কাম সার্ভ এন্ড পাম্প। শামীমেরটা আরও এপ্রোপিয়েট: ক্রিমিনাল সাপ্লাইয়ার্স টু দ্যা পলিটিশিয়ানস্‌।
মোট একুশ জন উচ্চ পদস্থ অফিসার আবু তাকেরকে শুনছিলেন। এসি-র শব্দ ছাড়া বাকি সব নিস্তব্ধ। এসি মানে এসিসট্যান্ট কমিশনার নন, এয়ার কন্ডিশন।
আবু তাকের নিজে হেটে হেটে সবার হাতে আনসার স্ক্রিপ্ট ধরিয়ে দিচ্ছেন।
জাকিরের ভাগে পড়ে বাংলা সাহিত্য ও সাধারণ জ্ঞান।
সবাই উত্তরপত্রে একাগ্র।
চোখে খাতা, হাতে কলম, মগজে আনসার স্ক্রিপ্ট, বুকে কমিশনার। আবু তাকের সাহেব ঘুরে ঘুরে দেখছেন আর বকে যাচ্ছেন অনর্গল: আমরা যে পরীা দিয়ে চাকুরি নিয়েছি তোমরা একশ বছর পড়েও তা পারবে না।
মডেল আনসার স্ক্রিপ্টে চোখ বুলাতে বুলাতে একটি লাইনে এসে জাকিরের চোখ আটকে যায়। অদ্ভুত লাইন- “নীলদর্পণ নাটকের রচয়িতা মীর মোশাররফ হোসেন।”
হোয়াট?
মনে মনে প্রশ্ন করে জিবে কামড় দেন জাকির, আঁতকে উঠা কামড়। এটি তার বদ অভ্যাস, ছোট বেলা হতে।
‘নীলদর্পণ’ নাটকের রচয়িতা দীনবন্ধু মিত্র। লেখা হয়েছে মীর মোশাররফ হোসেন। বাংলা সাহিত্যে নীলদর্পণ পিরিয়ডে মীর মোশাররফ হোসেন বলে কোন নাট্যকার কিংবা ঔপন্যাসিক ছিলেন না। ‘জমিদার দর্পণ’ নামের একটি নাটক আছে। এর রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন, মীর মোশাররফ হোসেন নয়।
সম্ভবত প্রিন্টিং মিস্টেক।
নীল দর্পণ আর জমিদার দর্পণের প্রতিবিম্বে এ রকম ভুল হতে পারে। টু এরর ইজ হিউম্যান। ভুল শোধরে দেয়া কৃতিত্বের কাজ, কর্তব্যও বটে। কমিশনার স্যার খুশি হবেন।
জাকির দাঁড়িয়ে দৃষ্টি টানেন আবু তাকের সাহেবের: স্যার, সাত নম্বর প্রশ্নের উত্তরটা আনসার স্ক্রিপ্টে ভুল উঠেছে। হবে দীনবন্ধু মিত্র, মীর মোশাররফ হোসেন লেখা হয়েছে, মোস্ট প্রোবাবলি ক্যারিক্যাল মিসটেইক।
আঁতকে উঠেন আবু তাকের সাহেব, লজ্জায় নয়, জাকিরের সাহস দেখে। সাহস নয়, রীতিমত দুঃসাহস, বেয়াদবি।
আবু তাকের সাহেব বিকৃত স্বরে বললেন: কী বললে? ক্যারিক্যাল মিসটেক? তুমি কী আমাকে কার্ক মনে করো? জানো, আমি কার্কদের সাথে কথাও বলি না! বললাম আমি নিজেই আনসার স্ক্রিপ্ট তৈরি করেছি আর তুমি আমাকে কার্ক বানিয়ে ছাড়লে, এতবড় হারামজাদা আমি তো দেখি নি! আমার উত্তরে ভুল? এ অসম্ভব।
জ্বী স্যার, ভুল।
হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট টু সে?
আরেকটু উত্তপ্ত হন আবু তাকের সাহেব। উত্তপ্ত হলে তাঁর কপাল আর মুখ প্রচন্ডভাবে কুঁচকে যায়, ঠিক এবড়ো থেবড়ো অ্যালুমিনিয়ামের ডেঙ্রি মত। সবাই খাতা হতে চোখ তুলে আবু তাকের সাহেবের উপর রাখেন। তিনি কাঁপছেন, চোখ জাকিরের দিকে। এত বড় দুঃসাহস কল্পনা করা যায় না। আবু তাকের মাথা ঘুরে পড়ে যাবার দশায় উপনীত।
জাকির আবার বলে উঠেন: সরি স্যার, নীলদর্পণ নাটকের রচয়িতা মীর মোশাররফ হোসেন নয়, দীনবন্ধু মিত্র। মীর মোশাররফ বলে কোন লেখক তৎকালে ছিল না। থাকলেও তিনি নীলদর্পণ লিখেন নি।
এবার প্রচন্ড রেগে যান জনাব আবু তাকের, তুমি কোন্‌- ব্যাচের?
ভয় পেলেও সাহস হারান নি জাকির। যারা জানেন তারা সহজে সাহস হারান না। অজ্ঞতা ভীরুতার ফ্যাটফরম,ঋদ্ধতা সাহসের আধার। জ্ঞান সাহসীদের কান্ডারি। জাকির ভুল ধরেছে, তার ভয়ের কিছু নেই। কারও বালখিল্য হুমকি জ্ঞানীদের এট বেস্ট হাসায় তার বেশি নয়।
তাকের সাহেব জাকিরের উত্তরের তোয়াক্কা না করে আবার শুরু করেন: তোমার চেয়ে অনেক সিনিয়র, অনেক জ্ঞানী ব্যক্তি দিয়ে আনসারস্ক্রিপ্ট তৈরি করা হয়েছে। আমি ভেবে পাচ্ছি না তুমি বিসিএস পাশ করলে কীভাবে? মীর মোশাররফ হোসেনকে চেন না। এমন একটি গর্দভ বিসিএস ক্যাডারের সদস্য, এটি ভাবতেও আমার লজ্জা হচ্ছে। ‘বিষাদসিন্ধু’ কী তোমার বাবা লিখেছে? নাকি তাও জানো না? জানবে কীভাবে, নকলিশ পাশদের অত জানার সুযোগ কোথায়? আমি পিএসসি-র মেম্বার হলে তোমাকে পিয়নের চাকুরিও দিতাম না।
বিনীত আত্মবিশ্বাসে উত্তপ্ত জাকির বললেন: ‘বিষাদসিন্ধ’ুর লেখক মীর মশাররফ হোসেন, মীর মোশাররফ হোসেন নয়। ‘মো’ আর ‘ম’ এক নয়; যেমন এক নয় ‘মল’ আর মোল্যা কিংবা গরু আর গুরু।
জাকিরের ধারাল জবাবে তাকির সাহেবের চোখে যেন মরিচ পড়ে। তিনি লাফ দিয়ে উঠেন এক হাত: এ ছেলে তো গন্ডমূর্খ। জাহাঙ্গীর নগর ভার্সিটিতে গিয়ে দেখে এসো, মীর মোশাররফ হোসেন হল। তারা কী ভুল করেছেন?
জ্বী স্যার, তাঁরা ভুল করেছেন।
বিরক্তিতে লাল হয়ে যান আবু তাকের সাহেব: না জেনে শাখামৃগের মত তর্ক করে সময় নষ্ট করো না। বাইরে পরীার্থীরা অপো করছে। কাজ করো। তোমার শাস্তি পরে হবে। দেখি তোমার চাকুরি কোন শালা বাঁচায়।
জাকির তার বক্তব্যের ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত, এক বিন্দু সংশয় নেই। বললেন: আমি স্যার জেনেই বলছি। আমার…
জাকিরের কথা কেড়ে নেন আবু তাকের: আমাকে শেখানোর চেষ্টা করো না, আমি যতটি বই পড়েছি তুমি ততটি বাক্যও পড় নি, কয় ধানের চাল খেয়েছ?
মুখটা মলিন করে বসে পড়ে জাকির।
রাগে গজগজ করছে তার বুক, তবে মাথা এখনও ঠাণ্ডা। বুক যতই গরম হোক, মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হয়। নইলে আবু তাকেরদের মত মো এবং ম একাকার হয়ে মোমের মত জমে যাওয়ার সম্ভাবনা। জাকিরের মাথা সহজে গরম হয় না, গরম হলে মুশকিল। বস-পস কিচ্ছু মানে না।
অফিসারেরা উত্তরপত্র বাদ দিয়ে তর্ক উপভোগ করছেন, রসালো তর্ক, যশোরের খেজুর রসের মত।
অভিব্যক্তিতে সবাই জাকিরের দিকে, কিন্তু কারও মুখে রা নেই। প্রতিবাদ মানে প্রতিঘাত, চাকরের অত সাহস থাকে না। হোক ডিসি, এসপি, জজ-ব্যারিস্টার, সচিব, কমিশনার সবাই চাকর। হেলাল চাকর-এর এব্রিভিয়েশন করেছে; চা-কর আর চা-করি হতে চাকরি।
ডেপুটি কমিশনার মাহবুব ও জামিল থেমে থাকতে পারলেন না। আবু তাকের সাহেবের কথা শেষ হলে দুজন এক সঙ্গে উঠে দাঁড়ান: স্যার, উইথ কাইন্ড পারমিশন, জাকিরের কথাই ঠিক, মীর মশাররফ নয়, দীনবন্ধু মিত্রই ‘নীলদর্পণ’ লিখেছেন।
এবার প্রচণ্ড েেপ যান আবু তাকের। মুখ আরও কুঁচকে, চোখগুলো বাচ্চাদের ইলেকট্রনিঙ্ পুতুলের মত উঠানামা করছে, মনে হয় সবাইকে গিলে খাবেন: তোমরা এখানে কয়জন?
একুশ জন।
কয়জেলার দায়িত্বে?
এক জেলার।
আমি কয়জন?
একজন।
কয় জেলার দায়িত্বে?
সতের জেলার।
তোমরা একুশ জন এক জেলার দায়িত্বে, আর আমি একজনই সতের জেলার প্রধান। অতএব মিজার ইউর সেলভ্‌স। ব্যাঙ, ব্যাঙই থাকো, হাতি হওয়ার চেষ্টা কর না। চুপ-চাপ কাজ করে যাও। ‘নীলদর্পণ’ নাটকের রচয়িতা মীর মোশাররফ, কোন ব্লাডি বলেছেন দীনবন্ধু? আমার চেয়ে বেশি জানলে তোমরাও কমিশনার হতে। আন্ডারস্ট্যান্ড?
জ্বী, বলে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়েন দুজন।
এবার জাকিরের মাথায় কিছুটা উষ্ণতা ঢুকে পড়ে। আসলে সে ডোন্ট-কেয়ার টাইপের, রেস্টিভ এন্ড ব্রেভ; কিন্তু সিনিয়রেরা বলেন অন্য কথা: বেয়াদব।
হ্যাঁ, প্রতিবাদিরা সবসময় সুবিধাভোগীদের কাছে বেয়াদব। সিনেমাতেও এমন।
বেপরোয়া ভঙ্গীতে পরোয়াহীন বিনয়ে জাকির বলে উঠেন: স্যার, আমার কাছে বইটা আছে, সময় দেন তো নিয়ে আসি।
ডেপুটি কমিশনার পুলিন বাবু নাভির গোড়ায় দুহাতকে প্রণামের ভঙ্গীতে ধরে রেখে জাকিরের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছিলেন।
জাকির তাকাচ্ছিলেন না, চোখ আবু তাকেরের দিকে। যমের চেয়ে বিপজ্জনক।
তাকাবে এ প্রত্যাশায় ডেপুটি কমিশনার পুলিন বাবু জড়ো হাত উপর-নিচ দুলিয়ে জাকিরকে মৌন ইঙ্গিতে বসানোর তথ্য সরবরাহ করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
জাকিরের কথায় আবু তাকের সাহেব আরও রেগে, এবার তেলে-বেগুনে তপ্ত কড়াই। চিৎকার দিয়ে বলে উঠেন: থাকতে পারে। তোমার ঐ বই যে ভুল নয় তার প্রমাণ কী? আমি কমিশনার বলছি বিশ্বাস হয় না, আর কোন্‌ বইয়ে কী লেখা আছে, কোথাকার কোন নচ্ছার কী লিখেছে তা নিয়ে তুমি তুলকালাম শুরু করেছ, বেয়াদব! চাকুরি করার ইচ্ছা আছে?
এবার পুলিন বাবু মরিয়া।
জাকিরকে থামাতে হবে, লণ ভাল নয়। আস্তে আস্তে জাকিরের পাশে গিয়ে দাঁড়ান।
কানে মুখ নিয়ে বলেন: তুই আমার বাপ, তোর পায়ে পড়ি যাদু, একটু থাম্‌। ‘নীলদর্পণ’ কেউ না, তুমিই লিখেছ, প্রয়োজনে আমি তোমার নামে অফিস আদেশ করে দেব, আমাকে রেহাই দাও। নিয়োগটা ভণ্ডুল করে দিও না।
এবার চমকে উঠে জাকির।
পুলিন বাবুকে বললেন: স্যার, এত বড় ভুল আমি মেনে নিতে পারব না। কমিশনার বললে কলা কি লিচু হয়ে যায়? অনেক কিছুর সীমা থাকে না, কিন্তু ভুলের সীমা থাকে, থাকতে হয়। তাই ভুল হলে মানুষ আপশোস করে। এজন্য ভুল সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে না। যারা সীমাহীন ভুল করে তারা ক্রিমিনাল। কমিশনারের মত গুরুত্বপূর্ণ পদে তাঁদের কীভাবে পোস্টিং দেয় সরকার? আমি বসব না, তাঁর অজ্ঞতা টেনে বের করব, চাকুরি থাক আর যাক।
ভয়ে কুচকে যান পুলিন বাবু: তোমার হাতে ধরি জাকির, এবার থাম, পরীার খাতিরে হলেও তুমি ান্ত হও। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ কর, তোমাকে আবার ফোর্স নিয়ে বাইরে যেতে হবে।
এসিস্ট্যান্ট কমিশনার মোনায়েম রাগে এতণ হুলো বিড়ালের মত ফুসছিলেন। তবু পুলিন স্যারের বিগলিত বিনয় তার সহানুভূতি টানে। জাকিরকে ল্য করে বললেন: স্যার,কমিশনার যা বলছেন তাই সঠিক। দুমাস আগে এ কইে এক সেক্রেটারি কালিদাসের বিখ্যাত উক্তি, “সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নেই”-চরণকে রবীন্দ্রনাথের বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন। দুজন মন্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। কেউ তো প্রতিবাদ করেন নি। আপনি কেন অযথা বিপদে পড়তে যাবেন, আপনি ছাড়া বাকি বিশ জনই তো চুপ।
আমি থাকলে মন্ত্রীর সামনেও প্রতিবাদ করতাম, জাকির জবাব দেয়।
পুলিন বাবু বললেন: এজন্যই তোমাকে দাওয়াত দেয়া হয় নি।
কেন জানি আবু তাকের সাহেব কিছু বলছেন না, এদের কথাতেও বাঁধা দিচ্ছেন না। হয়ত নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। তাঁর কপালে এসি-র বাতাসেও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে যায়।
আবু তাকের সাহেবের অজ্ঞতায় জাকির শঙ্কিত। করুণায় ঘেমে উঠে মন। এত বড় মাপের অফিসারের জ্ঞানের বহরের নিদারুন দীনতা করুণারই বটে। মেনে নেয় যায় না। মেনে নিলে পরীার খাতায় যারা সঠিক উত্তর দিয়েছেন তাদেরকে মার্ক দেয়া যাবে না। জাকির তা কিছুতেই করবে না।
জাকিরের পাশে আবু তোরাব, তার পাশে মোশাররফ। দুজনে ডেপুটি কমিশনারর্ যাংকের।
কাণ্ডকারখানা দেখে মোশাররফ সাহেব মুচকি মুচকি হাসছেন।
আবু তোরাব বললেন: মোশাররফ ভাই আপনার হাসারই কথা।
কেন?
কমিশনার স্যার আপনাকে নীলদর্পণের মত একটি বিখ্যাত নাটকের রচয়িতা বানিয়ে দিয়েছেন, হাসবেন না? আমি হলে এতণে ভবন হতে লাফ দিতাম খুশিতে।
তার কথা কেড়ে নেন হাসিব: বস ক্যান নট রং, জাকির স্যার, আপনি চুপচাপ আপনার ইচ্ছামত মার্কিং করে যান। অত ঝামেলা করে কাজ নেই।
আবু তাকের উত্তর পত্রে চোখ বুলিয়ে বুলিয়ে ফূঁসে চলেছেন।
কী ব্যাপার, এত তর্ক কিসের? দরজার দিকে সবার চোখ যায়।
ধবধবে জামায় আবৃত একজন লম্বা লোক ধীর পায়ে রুমে ঢুকে আবু তাকের সাহেবকে সালাম টুকেন। সবাই এক ঝলক তাকিয়ে। পুলিন বাবুর দেখাদেখি সবাই দাঁড়িয়ে, নিশ্চয় হোমরা চোমরা কেউ।
হ্যাঁ, হোমরা-চোমরাই। জয়েন্ট সেক্রেটারি কাতেব। সস্ত্রীক চাবেড়ায় এসেছেন। চাবেড়া মানে চাকুরির অজুহাতে বেড়ানো। রথ দেখা আর কলা বেচা।
সালাম নিলেন কিনা সেদিকে সাহেবের খেয়াল নেই। আবু তাকেরকে ল্য করে বললেন: কোন অসুবিধা স্যার?
এবার আবু তাকের সাহেবের মুখে জোয়ার আসে, কথার জোয়ার: দেখ, “নীলদর্পণ” নাকি মীর মোশাররফ হোসেনের লেখা নয়, দীনবন্ধু মিত্রের। শুনেছ কখনও?
আঁতকে উঠেন কাতেব সাহেব: কে বলেছে? কোন বানচুত? বলেন স্যার, দুটো লাথি মারি দুগালে। আপনার মুখের উপর কথা!
আমাদের গণ্ডমুর্খ সহকর্মী বেয়াদব জাকির।
লাথির ভাষা হারিয়ে ফেলেন কাতেব, তার চোখে আফশোসের কালো রাগ। জাকিরকে তিনি চেনেন। আসলেই সে শয়তান।
পিয়ন একটা চেয়ার এগিয়ে দেয়। চেয়ারের পিঠে হাত রেখে অজির সাহেব বললেন: আমি বুঝি না, আজকালকার ছেলেগুলো সব ক্রেডিট কেন হিন্দুদের দিয়ে দিতে চায়। এজন্যই তো আজ মুসলমানদের এ দুর্দশা। আই এ্যাম সিউর, ‘নীলদর্পণ’ মীর মোশাররফ হোসেন লিখেছেন, দীনবন্ধু নয়। চন্দ্রসূর্য মিথ্যা হতে পারে কিন্তু আপনি কীভাবে মিথ্যা হবেন? হিন্দুরা বড় কিপটে, তারা দর্পণ দিয়ে কী করবে? মোশাররফ সাহেব আমার পাশের বাড়ির লোক। তার সাথে আমার অনেক বার দেখা হয়েছে। ভদ্রলোক খুব জ্ঞানী। আমাকে খুব স্নেহ করেন। এ তো কিছুদিন আগেও টেলিফোনে আলাপ হয়েছে। বড় মিষ্টি কণ্ঠ, সাতীরার ীরের মত।
কাতেব সাহেবের মিথ্যাচারে সবার মাথা নত। আবু তাকের নিজেও সংকোচে মুখ ফিরিয়ে জাকিরের উপর চোখ রাখেন।
কাতেব সাহেবের সেদিকে খেয়াল নেই, তিনি বলেই যাচ্ছেন: এগুলো নিয়ে এত তর্ক করে লাভ কী স্যার? বেলজিয়ামের দর্পণই সবচেয়ে ভাল। মোশাররফের দর্পণ কিংবা দীনবন্ধুর দর্পণ দিয়ে ঈদানীং চলে না, ব্যাকড্যাটেড, সহজে নষ্ট হয়ে যায়। জার্মানির দর্পণের উপর কোন দর্পণ নেই। আছে কি?
আবু তাকের এবার কাতেব সাহেবকে ধমক লাগান: তুমি বিষয়টা বুঝতে পার নি কাতেব। আমরা বইয়ের কথা বলছি, আয়নার কথা নয়। আর লেখকের সাথে তোমার দেখা হয় কীভাবে? মানলাম তোমার পাড়ার লোক কিন্তু তিনি তো তোমার জন্মের অনেক পুর্বেই মারা গেছেন।
কাতেব সাহেব তথমত খেয়েও এগিয়ে যান: ঠিক আছে স্যার দেখা হয় নি, আমার জন্মের আগেই মারা গেছেন। তবে আমাদের পাড়ায় দুজন মোশাররফ আছেন। একজন মারা যেতে পারে। আমি যার কথা বলছি তিনি মারা যান নি।
তুমি এসব কী বলছ?
দর্পণের কথা বলছি। লেখক খুব চমৎকারভাবে নীলদর্পণ উপন্যাসে নীল রঙের আয়নার বর্ণনা দিয়েছেন। আমি তো ঐ বই পড়ে আপনার ভাবীকে তিনটা নীল আয়না কিনে দিয়েছিলাম। খুব ভাল বই স্যার। কিছু মনে না করলে আপনার জন্য পাঠিয়ে দিতে পারি।
আবু তাকের বললেন: নীলদর্পণ উপন্যাস নয়, নাটক।
জ্বী স্যার। তবে নাটক হোক কিংবা উপন্যাস হোক সবই তো মিথ্যা কথার ফুলঝুরি, এগুলোর কোন দাম আছে? আপনি স্যার একটা সার্কুলার করে দিন যে, নীলদর্পণ মীর মোশাররফ হোসেনের লেখা, দীনবন্ধুর নয়।
আবু তাকের ধমকে সাথে বললেন: থামো, তুমি কি বই পড়?
কী বলেন স্যার। আমি রবীন্দ্রনাথের সবগুলো বই পড়েছি। কি গল্প, কি উপন্যাস কি কবিতা যেন মাধুর্যের বন্যা, আহ্‌, বই নয়, যেন সিনেমা। শুরু করলে ছাড়তে ইচ্ছে করে না। তবে শেষের কবিতার মত বই আমি আর দেখি নি। প্রতিটি কবিতা প্রাণের ছোঁয়ায় ভরা। এত সুন্দর কবিতার বই বাংলা সাহিত্যে আর নেই। বনলতা সেন আর শেষের কবিতা দুটো পাশাপাশি রেখে আমি পড়েছি। দুটোই অসাধারণ। শেষের কবিতা আমার মেয়েকে পড়তে দিলাম। মেয়েটাও ব্রিলিয়ান্ট। পড়ে বলল: বাবা এত ভাল বই আমি আর পড়ি নি। আপনি তো জানেন আমার স্ত্রী ভাল গায়িকা। সে শেষের কাব্যগ্রন্থের সবগুলো কবিতা মুখস্থ করে ফেলেছে। রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক না হলেও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আমাদের একটা পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে শেষের কবিতা দিয়ে। তিনি যেন আমাদের জন্যই শেষের কবিতাটি লিখে গেছেন। কী সুন্দরভাবে রবীন্দ্রনাথ শেষের কবিতায় প্রকৃতির বন্দনা করছেন:
“আহা আজি এ বসন্তে…….” কী সুন্দর কথা।
সবার মুখ চাপা হাসিতে ফেটে পড়ার দশা। চারিদিক তাঁকিয়ে কাতেব একটু থামেন। বুঝতে পারেন কোথায় কিছু বিভ্রাট ঘটেছে। তিনি তো জানেন, শেষের কবিতা তিনি পড়েন নি। ভেবেছিলেন তিনি না পড়লে অন্যরা পড়বে কেন?
আবু তাকেরের উপর হতে চোখ ঘুরিয়ে সবার মুখে বুলিয়ে যান। সবার মুখে কেমন একটা উপহাসের ছটা, এবার তিনি শিওর, তার ভন্ডামী ধরা পড়ে গেছে। তাতে কিছু যায় আসে না, অন্যদিকে মোড় ঘুড়িয়ে দেন। নিজেকে এত অজ্ঞ প্রমাণ করতে দেয়া যাবে না।
কাশি দিয়ে আবার শুরু করেন: আমরা কি? স্বয়ং সেঙ্পিয়ার পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। সাধে কী নোবেল পেয়েছেন?
এবার সবাই একসাথে আগের চেয়ে জোরে হেসে উঠেন, আবু তাকেরও। অবস্থা বেগতিক। তাড়াতাড়ি কাতেব রহমানের কানে কান লাগায় পিএস: স্যার, থামুন, আমি না বলেছিলাম গল্পটি যেখানে সেখানে না বলার জন্য।
কিন্তু আমি এ বক্তব্য দিয়ে গত বছর রবীন্দ্র জয়ন্তীতে বিশটি হাততালি পেয়েছিলাম। এরা মনে হয় কম জানে।
তবু বলে যেতে থাকেন: আমি অফিসার নিয়োগের পরীায় ইতিহাসে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী একজনকে প্রশ্ন করেছিলাম: আকবরনামার লেখক কে?
বলেছিলেন: আবুল ফজল।
আবুল ফজল সাহেবে কে ছিলেন এবং বাড়ি কোথায়? প্রশ্নের উত্তরে যা বলেছেন তা শুনলে আপনি হার্টফেল করবেন। বলে কি না আবুল ফজল সম্রাট আকবরের সভা কবি ছিলেন। অথচ আবুল ফজল ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি। বাড়ি চট্টগ্রাম। আমার সাথে তাঁর খুব খাতির ছিল। তিনি নিজেই বলেছেন আকবরনামা তাঁর লেখা।
কাতেবের কাণ্ড দেখে সবাই হতভম্ব।
জাকির কিন্তু স্বাভাবিক। সে কাতেবের সাথে অনেকদিন কাজ করেছে। অফিসার ও প্রভাষক নিয়োগের ইন্টারভিউতে কাতেব সাহেবের ভেড়া থিওরির ইমপ্লিমেনটেশন এখনও হাসির জোয়ারে ভাসিয়ে ছাড়ে। তার আসল নাম কাতেব রহমান, সবাই ডাকেন খায় রহমান। যা পান তা-ই খান।
তাকের সাহেবের ধার কম হলেও ভার আছে। খায় রহমানের ধার-ভার কিছু নেই। আস্ত একটা বলদ।
চার নং প্রশ্ন ছিল বাগধারা। অর্থসহ বাক্য রচনা, প্রথমে- ‘গড্ডালিকা প্রবাহ’।
সেখানেও জাকির প্রতিবাদ করে: স্যার, গড্ডালিকা নয়, গড্ডলিকা।
কাতেব সাহেব কলমের মুখে ছিপি ভরতে ভরতে বলেছিলেন: ত্রিশ বছর চাকুরি করছি, কোনদিন গড্ডলিকা শুনি নি, তুমি কী আবোলতাবোল বলছ? এজন্যই তো কেউ তোমাকে পছন্দ করে না। ডুন্ট বি সিলি।
জাকির কাতেব সাহেবের কথা গায়ে মাখার পাত্র নয়। সে জানে চোরের মায়ের বড় গলা। কাতেব সাহেব চুরি করেন না তবে ছাড়েন না কিছু, যা পান তাই খান, রীতিমত সর্বভূক।
জাকির বললেন: বাংলা ভাষায় গড্ডালিকা প্রবাহ বলে কোন বাগধারা নেই।
কাতেব সাহেবের কোষে কোষে বিরক্ত ছড়িয়ে পড়ে: আমাকে বাংলা শেখাতে এসো না। গড্ডালিকা প্রবাহ অর্থ স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়া। গড্ডালিকা অর্থ স্রোত।
জাকির এবার হেসে উঠে। কাতেব সাহেব বিরক্তিতে মুখ লাল করে চোখে এক মগ ঘৃণা নিয়ে জাকিরের দিকে তাকান।
চন্দন জাকিরকে চুপ মেরে যাবার পরামর্শ দেয়।
জাকিরকে চুপ মেরে যেতে দেখে কাতেব সাহেব উল্টো বুঝেন। বেটা ভুল বুঝতে পেরে চুপ মেরে আছে, তাকে ছাড়া যায় না।
বললেন: প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে পড়ে আসছি ‘গড্ডালিকা’ তুমি সেদিনের ছ্যাবলা ছেলে ‘আকার’ তুলে দিয়ে আমাকে বাংলা শেখাচ্ছ। পিএসসি তোমাদের মত গর্দভদের কীভাবে সিলেক্ট করে আমি বুঝি না। আমি তোমার ‘আকার’ তুলে দেব।
বোর্ডের সদস্য বাংলার প্রফেসর জাহিদ সাহেবের দিকে তাকান কাতেবর রহমান: জাহিদ সাহেব, আপনি তো বাংলার শিক, অনেক লেখা-জোকাও আছে; আমার সার্ভিসের গাধাটাকে কিছুদিন বাংলা পড়াতে পারবেন? এভাবে আকার তুলে দিতে থাকলে তো বাংলা ভাষার বারোটা বাজবে, ‘বাবা’ হয়ে যাবে ‘বব’ এবং ‘মাল’ হয়ে যাবে ‘মল’।
জাহিদ সাহেব রাশভারী মানুষ। প্রয়োজনের বাইরে একটা কথাও বলেন না। তবে বলতে শুরু করলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেই ছাড়েন, অনেকটা কচ্ছপের মত। কাতেব সাহেবের রিকোয়েস্ট তাকে কিছু বলার প্রেরণা দেয়: স্যার, ফয়সল সাহেব ঠিকই বলেছেন। ‘গড্ডালিকা’ নয়, ‘গড্ডলিকা’। গড্ডালিকা শব্দের অর্থ স্রোত নয়, ভেড়া।
কাতেব সাহের একটা ধাক্কা খায়। লজ্জা আর অপমানের ঝাপটায় মুখটা জণ্ডিস রোগীর মত ফ্যাকাশে হয়ে উঠে। তবে তা ণিকের জন্য। তিনি এসব বিষয়ে অভ্যস্ত। চাকুরি জীবনে এমন কোন জায়গা নেই যেখানে অপমানিত হন নি। চট্টগ্রামের মৌলবীর দোকানে ছাত্ররা চড় মেরে মুখ ফাটিয়ে দিয়েছিল। যে ছেলে চড় মারে তাকে নিয়ে এক সপ্তাহ পর মিনিস্টার সাহেবের আশীর্বাদ নিতে ঢাকা যান। মুর্খ আর পশু সমান, পশুর আবার লজ্জা কী?
কাতেব সাহেব গোয়াড়ের কণ্ঠে উম্মাদ হয়ে উঠেন: আপনি এ থিওরি পেলেন কোথায়। সারাজীবন ‘গড্ডালিকা প্রবাহ’ লিখে আসছি। আজ বলছেন গড্ডলিকা প্রবাহ, এরূপ ভুল শিখিয়েই তো জাতির বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছেন। বাংলা শিক হয়ে বহুল প্রচলিত একটা বাংলা শব্দের বানান জানেন না, কীভাবে ছেলেদের পড়ান।
অন্য কেউ হলে রেগে যেতেন কিন্তু জাহিদ সাহেব রাগলেন না, কাতেব সাহেবের অজ্ঞতায় একটু অবাক হলেন মাত্র। কাতেব সাহেবের সেদিকে খেয়াল নেই। তিনি বলে যাচ্ছেন: আপনার মত অজ্ঞ শিকেরা যাই শেখান, মেধাবীরা গড্ডালিকাই লেখবে। আপনারা ভুল করতে পারেন আমি পারি না।
ইতোমধ্যে তিনি চারটি বাংলা গ্রামার বই আনিয়ে নিয়েছেন। তিনটিতেই লেখা ‘গড্ডালিকা’ একটিতে ‘গড্ডলিকা’।
হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেন কাতেব সাহেব: দেখুন, তিনটা বইতে ‘গড্ডালিকা’ আর আপনারা বলছেন ‘গড্ডলিকা’। ভুল নিয়ে বসে থেকো না শেখার চেষ্টা করো। জাহেদ সাহেব আপনি শিক মানুষ, আপনার কাছ হতে আমি এমন আশা করি নি।
এবার জাহেদ সাহেবকে উষ্ণতায় ধরে: আপনি যা করছেন এবং বলছেন তা সঠিক নয়। বস্তুত যারা প্রকৃত সত্যমিথ্যা যাচাই না করে এভাবে প্রচলিত স্রোতে গা ভাসিয়ে দেন এবং ‘গড্ডলিকা’ শব্দকে ‘গড্ডালিকা’ লিখেন তাদের জন্যই ‘গড্ডলিকা প্রবাহ’ বাগধারাটির উৎপত্তি।
ঘটনাটি মনে মনে আবৃত্তি করে আবার হেসে উঠে জাকির।
এ প্রসঙ্গে আর একটা কথা মনে পড়ে যায় জাকিরের। গল্পটির নাম ‘গার্লিক স্যার’। মিহির গল্পটি বলেছেন।
কাতেব সাহেব তখন ঢাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে। পদটিতে বাইরের লোকদের আনাগোনা প্রবল। কিন্তু কাতেব সাহেব ইংরেজি জানেন না। এ পদে থাকতে হলে কিছু ইংরেজি জানা আবশ্যক। বাজার হতে অনেকগুলো ইংরেজি শেখার বই কিনেছেন। অনেক শব্দ শিখেছেন কিন্তু ‘বসুন’ শব্দের ইংরেজিটা এখনও পান নি। বইতে বসা, বসব, বসল প্রভৃতি শব্দের ইংরেজি অর্থ আছে কিন্তু বসুন শব্দের নেই।
এতদিন যেখানে চাকুরি করেছেন সেখানে ইংরেজি বলার প্রয়োজনীয়তা তেমন একটা হয় নি। এখন ইংরেজি জানা অপরিহার্য; বলতে না পারলে সম্মান আর থাকে না। জুনিয়রেরাও দিব্যি ইংরেজি বলে যাচ্ছে, তিনি পারেন না, চরম লজ্জা।
অন্তত বিদেশিদের সাথে ইংরেজি বলতে হয়, সৌজন্যবোধটুকু দেখাতে হয়। সৌজন্য দেখাতে প্রথম যে শব্দটি প্রয়োজন তা হচ্ছে ‘বসুন’।
কিন্তু তার ইংরেজি প্রতিশব্দ খুজে পান না। কারও নিকট হতে জানার মত আদর্শিক মনোবলও তার নেই। এত বড় পদের একজন মানুষ হয়ে অন্য কারও কাছ হতে শিখবেন কী করে? কেউ তার অজ্ঞতা জেনে যাক- মরে গেলেও এমনটি হতে দিতে পারেন না। এটি মুর্খদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, এজন্য তারা আজীবন মূর্খ থেকে যায়।
হঠাৎ একদিন তার কিশোর ছেলের ওয়ার্ড বুকে বসুন শব্দের অর্থ পেয়ে যান।
সস্তামানের ছাপা ওয়ার্ড বইটিতে অসংখ্য প্রিন্টিং মিসটেক। বইটিতে গার্লিক শব্দের অর্থ বসুন লেখা হয়েছে। সবাই জানে এধৎষরপ (গার্লিক) শব্দের অর্থ রসুন। ভুলবশতঃ ‘ব’-এ বিন্দু না পড়ায় রসুন এর স্থলে ‘বসুন’ হয়ে গেছে। সেদিন অনেণ চেষ্টা করে বসুন শব্দের ইংরেজি হিসেবে গার্লিক শব্দটি মুখস্থ করে নেন জনাব কাতেব।
এক সপ্তাহ পর আসবে এক দল বিদেশি বিশেষজ্ঞ। সাথে থাকবেন সচিব স্বয়ং। কাতেব সাহেব সেজেগুজে প্রস্তুত, আজ বসুন শব্দের ইংরেজি তাঁর আয়ত্ত্বে। সৌজন্য দিয়ে সবাইকে হতবাক করে দেবেন।
যথাসময়ে চলে আসেন সচিব মহোদয় উইথ ফরেন ডেলিগেট।
অতিথিদের বসার স্থান দেখিয়ে দিয়ে কাতেব সাহেব সচিব মহোদয়কে উদ্দেশ্য করে বললেন, গার্লিক স্যার। প্লিজ, গার্লিক স্যার।
ডেলিগেটরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে। তারা কিছু বুঝতে পারছেন না।
সচিব বললেন: হোয়ার ইজ গার্লিক?
কাতেব সাহেব বিনয় বিগলিত স্বরে বললেন: অন দ্যা চেয়ার গার্লিক।
কিন্তু চেয়ারে কোন গার্লিক নেই, তবু খুজছেন অতিথিরা। না পেয়ে ধমক লাগান সচিব মহোদয়: কোথায় গার্লিক?
অন দ্যা চেয়ার, স্যার।