Translate

Sunday, 12 February 2017

আমি স্যমন্তক-এর নায়িকার মতো হতে চাই / মিনহা সিদ্দিকা

ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা স্যমন্তক উপন্যাস পড়ছি।এখনও পুরো শেষ করতে পারিনি। যতটুক
পড়েছি তাতে, স্যমন্তকের নায়িকার হৃদয়গ্রাহী প্রজ্ঞা, মৃণ্ময় উদারতা, আলোময় ভালোবাসা, দূরদর্শী চিন্তা আর সহজ-সরল কিন্তু অনুপম বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপে আমি মুগ্ধ। বিশেষ করে নায়িকার আকর্ষণীয় মেধা আমাকে যেমন করেছে ঈর্ষান্বিত তেমন করেছে অনুপ্রাণিত। আমার জীবনের লক্ষ্য এখন স্যমন্তকের নায়িকার মতো মেধা ও প্রজ্ঞা অর্জন। আপনারা আমাকে দোয়া করবেন।

স্যমন্তক সম্পর্কে আমার স্ত্রী বিভার অভিমত / প্রফেসর দীপক কুমার নাগ

বিভা

স্যমন্তক সম্পর্কে আমার স্ত্রী বিভার অভিমতস্যমন্তক উপন্যাসের কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার পর আমার স্ত্রী বিভা হঠাৎ বলে বসল, কি গো, তুমি যে মহত্তের কথা বলেছিলে, বইতে তো ঠিক তা নেই। মনে হচ্ছে নায়কের (লেখক) সঙ্গে বইয়ের নায়িকার প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে।
আমি বললাম, বইটি পড়ে শেষ করো। মন্তব্য পরে করো।
আমার স্ত্রী বইটি পড়া শেষ করে বললেন, আমাদের সমাজে এ ধরণের লোক কি সত্যিই আছে? লেখক যদি আমার বয়সে বড়ো হয়ে থাকে তাহলে তাকে আমার প্রণাম দিও। আর বয়সে যদি ছোটো হয়ে থাকে বাসায় নিয়ে আসবে। আমি তাকে আশীর্বাদ করব।

স্যমন্তক : অনুভূতির বিশাল ক্ষেত্র / শ্রাবন্তীনাহা অথৈ


স্যমন্তক পড়ে আমি যারপর নেই মুগ্ধ।ড. মোহাম্মদ আমীন তাঁর অনুভূতির সবটুকু যেন নিংড়ে দিয়েছেন এখানে। অক্ষরে অক্ষরে কাগজের মাঝে বাক্যে বাক্যে লীলায়িত হয়েছে
প্রাকৃতিক লীল। সৌন্দর্য আর আনন্দ, জীবনের সংগ্রামে অর্জনের ঢেউ।  স্যমন্তক আমার মনে একই সঙ্গে আনন্দ-বেদনা, রোমাঞ্চ-উদ্দীপনা, হতাশা-প্রত্যাশা, প্রাপ্তির প্রশান্তি, উদারতার অনুবোধ, ভালোবাসার মুগ্ধতা, সৃষ্টির নৈবদ্য আর জীবনানুভবের মাহাত্ম্য লালনের মতো বহুমুখী চেতনায় আন্দোলিত করেছে। স্যমন্তক আমার পড়া শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের অন্যতম। এটি শুধু উপন্যাস নয়, অনবদ্য অনুভূতির বিশাল ক্ষেত্র।

স্যমন্তক / মোস্তফা আজিজ

                                              স্যমন্তক

স্যমন্তক কি শুধুই উপন্যাস?
না, আগ্রহের বাসর এটি, চিরন্তন অভিলাষ।
কী নেই স্যমন্তকে? 
প্রেম-ইতিহাস-স্মৃতিকথা অনুপম যতো কাব্যগাথা;
শ্রেষ্ঠ হওয়ার কৌশল, মহানুভব অবিকল।
 লাইনে লাইনে বিস্ময়, অনুভূতির মায়া
মানুষের জন্য মানুষ, পরিস্ফুট উদারতা ভালোবসার কায়া।
উঁচু-নিচ সব একাকার এখানে প্রাপ্তি নয়, দেওয়ার স্নিগ্ধতায়
নিপুন কারুকাজ শব্দে, বাক্যে সংলাপ আর অভিধায়।
নায়ক-নায়িকার আচরণ, আনুগত্য-শ্রদ্ধায় নত হয়ে যায় মস্তক
                             আমি মুগ্ধ, আমি অভিভূত। তাই বারবার পড়ি স্যমন্তক।

Sunday, 5 February 2017

স্যমন্তক একটি অনবদ্য উপন্যাস / হায়াৎ মামুদ

স্যমন্তক : একটি অনবদ্য উপন্যাস
উপন্যাস নির্মল আনন্দের উৎস। তাই সাহিত্যজগতে উপন্যাস সবচেয়ে জনপ্রিয়। আমি নিজেও ছোটোবেলা থেকে উপন্যাসের ভক্ত ছিলাম।কোনো কোনো উপন্যাস পাঠকের মনে গভীর দাগ কাটে।
উপন্যাসের অচেনা-অজানা চরিত্রসমূহের নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় মনপ্রাণ একাকার হয়ে যায়। গভীর নিবেশে আবেশিত হয়ে ওঠে হৃদয়। ব্যক্তিগতভাবে অচেনা চরিত্রগুলোও ভাবনায় শিহরণ তোলে।
যদি আপনি এমন একটা উপন্যাস পড়েন, যার প্রায় সবকটি চরিত্র আপনার পরিচিত, শ্রদ্ধার্হ, খ্যাতিমান ও প্রিয়- তাহলে কেমন লাগবে? কেমন শিহরিত আনন্দে কেঁপে উঠবে অনুভূতি? ভাষায় এটি প্রকাশ করা যায় না। তবে, স্যমন্তক উপন্যাস পড়লে এমন বিরল অনুভূতির পুরোটাই আস্বাদন করতে পারবেন। পরিচিত চরিত্রসমূহের বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ ‘স্যমন্তক’ উপন্যাসের অন্যতম আকর্ষণ। প্রতিটি লাইন, প্রতিটি কথা আগ্রহের অভাবনীয় মুগ্ধতায় অনুপম। কথোপকথনের মাঝে শালীনতার সঙ্গে নিবিড় মমত্ববোধ উপন্যাসটিকে সত্যিকার অর্থে অসাধারণ করে তুলেছে। উপ্যাসের লেখক ড. মোহাম্মদ আমীনের চিন্তাচেতনার বিরল গভীরতা স্যমন্তক উপন্যসে নিখুতভাবে ফুটে ওঠেছে।
‘স্যমন্তক’ কোনো সাধারণ উপন্যাস নয়। বাস্তবতার নিরিখে জীবনাভিজ্ঞতার রাশি রাশি বিস্ময় নিয়ে রচিত এ উপন্যাসের শৈল্পিক বিবরণ বস্তি হতে রাজপ্রসাদ পর্যন্ত বিস্তৃত। রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবনের সব কিছু ঘটনার কারণে উঠে এসেছে বিরল বাস্তবতা হয়ে। প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং নব্বইয়ের দশকে বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান অনেক সাহিত্যিক, শিক্ষক, প্রশাসক ও বুদ্ধিজীবী স্যমন্তকের চরিত্র। উদাহরণস্বরূপ কবীর চৌধুরী, হাসনাত আবদুল হাই, হুমায়ুন আজাদ, জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, আলাউদ্দিন আল আযাদ, ইতিহাসবেত্তা আবদুল হক, মনিরুজ্জামান,
আনিসুজ্জামান, হায়াৎ মামুদ, অরুণাভ সরকার, শিল্পী এস এম সুলতান, নরেন বিশ্বাস, দেলোয়ার হোসেন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, আহমদ ছফা প্রমূখের নাম উল্লেখ করা যায়। আমার একজন ছাত্রী স্যমন্তকের নায়িকা। বস্তিতে বেড়ে ওঠা এ মেয়েটা এখন অক্সফোর্ডের অধ্যাপক। বস্তি থেকে অক্সফোর্ড- কীভাবে সম্ভব হলো? বস্তুত এর অনাস্বাদিতপূর্ব বিবরণই স্যমন্তক।
স্যমন্তক কী ধরণের উপন্যাস? নানামুনির নানা মত। কেউ বলেন, মনস্তত্বমূলক উপন্যাস। কেউ বলেছেন, আত্মজীবনীমূলক স্মৃতিচারণ। কারও কাছে এটি চেতনাপ্রবাহমূলক উপন্যাস। এক ঔপন্যাসিক বলেছেন, এটি কাব্যধর্মীমূলক প্রেমকাহিনি, একজন বলেছেন সামাজিক উপন্যাস। কয়েকজন এটাকে আর্থ-সমাজিক প্রেক্ষাপটে বিধৃত ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসাবেও মন্তব্য করেছেন। বিখ্যাত একজন সমালোচকের ভাষায়, এটি উদ্দেশ্যমূলক কাহিনি উপন্যাস। লেখকের মতে, জৈবন্তিক উপন্যাস। আমার মতে, এটি এখানে বর্ণিত সবধরণের উপন্যাসের সমন্বয়ে গঠিত একটি ব্যাষ্টিক উপন্যাস। যেখানে সকল প্রকার উপন্যাসের স্বাদ একসঙ্গে পাওয়া যায়। এ যেন একের ভেতর অনন্ত। যেদিক দিয়ে বিবেচনা করা হোক না কেন, সব উপাদান স্যমন্তকে সমৃদ্ধ ভাবনায় উপছে। জৈবিক বা সামাজিক বন্ধন ছাড়াও কীভাবে মানুষ রক্ত সম্পর্কের চেয়েও আপনজন হয়ে যায়, তার একটি চমৎকার দলিল স্যমন্তক।ভালোবাসা থাকলে পৃথিবীতে আর কিছু লাগে না- এটিই স্যমন্তকের মূলকথা।
স্যমন্তক উপন্যাসের বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিটি লাইনই হৃদয়গ্রাহী, মুখস্থ করে রাখার মতো। ভালোবাসা- দ্রোহ, স্নেহ-প্রেম, স্বার্থিক দ্বন্দ্ব, মায়া-মমতা-অভিমান, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, পিতাপুত্র-পরিবার, ধর্ম, রাজনীতি, ইতিহাস, নগরজীবন, গ্রামীণজীবন, মূল্যবোধ, শিক্ষাব্যবস্থা, যোগাযোগ, প্রশাসন, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ, বিশ্বপ্রকৃতি, দারিদ্র্য এমনকি বস্তি হতে শুরু করে মনুষ্য জীবনের সঙ্গে জড়িত সবকটি বিষয় নিখুঁত মাধুর্যে বিধৃত হয়েছে স্যমন্তকে।
উপন্যাসের চরিত্রসমূহ অধিকাংশ পাঠকের কাছে পরিচিত। তাই লেখককে প্রতিটি সংলাপ খুব সাবধানে লিখতে হয়েছে । সংলাপগুলো পড়লে বোঝা যায়, লেখক বাস্তবতার ভিত্তিতে উপন্যাসটি রচনা করেছেন। আমার সংলাপ ঠিক অবিকল আমার কথা যেন। তেমনি হুমায়ুন আজাদ বা অন্যান্যদের বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য। ঋদ্ধ সংলাপের সঙ্গে পরিশীলিত রসবোধ, উত্তম উদ্দেশ্য, ভাবনার প্রসারতা ও মানবতার স্ফূরণ উপন্যসটিকে অনবদ্য করে তুলেছে। জীবন থেকে নেওয়া ঘটনায় বিন্যস্ত এমন হৃদয়গ্রাহী উপন্যাস ইতোঃপূর্বে আমি পড়িনি। প্রচ্ছদও হয়েছে চমৎকার। নামকরণ নিয়ে আলোচনা বাহুল্য। এককথায় বলে দেওয়া যায়- এমন সার্থক নামকরণ খুব একটা দেখা যায় না।
আর একটি বিষয় না-বললেই নয়। রচনা, কল্পনা, আল্পনা, টুটুল ও বাবুল এবং নায়ক কোন ধর্মাবলম্বী তা স্যমন্তক পড়ে বুঝা যাবে না। এরকম নাম যে কোনো ধর্মাবলম্বীর হতে পারে। চরিত্রসমূহের কথোপকথন বা কর্মকাণ্ডেও ধর্মীয় অনুষঙ্গের তিল পরিমাণ ইঙ্গিত পাওয়া যাবে না। অথচ এ চরিত্রগুলোর কর্মকাণ্ড দ্বারাই বাকি চরিত্রগুলো প্রভাবিত হয়েছে।এটি স্যামন্তকের একটি বিরল বৈশিষ্ট্য। মানুষের ভালোবাসা কিংবা প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডের পরম উৎকর্ষতায় প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের আবশ্যকতা কতটুকু তা স্যমন্তক সুন্দরভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে। অসাম্প্রদায়িক মনোভাব ভালোবাসা আর মানুষের সম্পর্ককে কত নিবিড় ও গভীর মানবতার সীমাহীন আনন্দে ভরিয়ে দিতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্যমন্তক।
উদ্দেশ্য, কাহিনি, চরিত্র, বিষয়-বর্ণন, বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ, কাব্যিকতা, পরিশুদ্ধ জীবনবোধ, স্পর্শকাতর সম্পর্ক, মানবতার উৎকৃষ্ট নিদর্শন, সামগ্রিক জীবনবোধ ও পরিণতি বিবেচনায় বাংলা সাহিত্যে এমন আর কোনো উপন্যাস আছে বলে আমার জানা নেই। এটি হতে পারে বাংলা সাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস।

Saturday, 13 August 2016

ব্যাকরণ : অভিজ্ঞতার দ্যোতনায় নতুন অভিধা /ড. মোহাম্মদ আমীন


ছোটবেলায় পড়েছি, “ যে পুস্তক পাঠ করিলে ভাষা শুদ্ধভাবে লিখিতে, বলিতে, পড়িতে ও বুঝিতে পারা যায়- তাহাকে ব্যাকরণ বলে।” এটি আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সংজ্ঞার্থের শিশুরূপ। তিনি বলেছেন, “যে বিদ্যার দ্বারা কোনও ভাষাকে বিশ্লেষ করিয়া তাহার স্বরূপটী (স্বরূপটি) আলোচিত হয়, এবং সেই ভাষার গঠনে ও লিখনে এবং তাহাতে কথোপকথনে শুদ্ধ-রূপে তাহার প্রয়োগ করা যায়, সেই বিদ্যাকে সেই ভাষার ব্যাকরণ বলে।” ব্যাকরণ নিয়ে রচিত পৃথিবীর সব বৈয়াকরণের সংজ্ঞার্থ প্রায় অভিন্ন। আমি কিন্তু প্রচলিত সংজ্ঞার্থসমূহের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ না-করে সংজ্ঞার্থগুলোর বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করতে চাই। ব্যাকরণ যদি প্রচলিত সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে ভাষা, প্রকৃতির মতো প্রত্যহ নতুন আঙ্গিকে আমাদের বিমোহিত করার সুযোগ পেত না। সুনীতিবাবুর ‘টী’ আমরা ‘টি’-লিখতে পারতাম না। 
অনেকে বলেন, ভাষা নদীর মতো। তা যথার্থ নয়; ভাষাকে এত ক্ষুদ্র বৈচিত্র্যে সীমাবদ্ধ করা সমীচীন মনে হয় না। আমি বলি, ভাষা প্রকৃতির মতো; নদী প্রকৃতির একটি উপাদান মাত্র। ভাষার প্রতিবর্ণকে প্রকৃতির একেকটি উপাদানের মতো ভাবা যায় — বাংলা ভাষায় ‘দন্ত্য-ন’-কে যদি ধরা হয় নদী; হ-হিমালয়, আ- আকাশ, স- সমুদ্র, ঐ— ঐশ্বর্য। নদী থেকে সাগর; হ থেকে হিমালয়; ম থেকে মাটি; আ থেকে আকাশ; আকাশ থেকে বৃষ্টি, বৃষ্টি থেকে বন্যা, পলি, সবুজ- - -। ভাষাকে নদীর মতো করে ভাবা হলে ‘দন্ত্য-ন’-এর মতো একটা অক্ষর নিয়ে ভাষাকে সীমিত অঞ্চলে মরার অপেক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকতে হতো, এভাবে হারিগে গেছে কত ভাষা, হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। ন-কে চলতে হলেও ম-লাগে। সুতরাং ভাষা নদীর মতো নয়, ভাষা প্রকৃতির মতো বলেই এটি এত বৈচিত্র্যময়, ভাষার এত উত্থান, এত হৃদয়বিদারক পতন এবং এত আকর্ষণীয় স্বভাব-তাণ্ডব। 
প্রায় সব সংজ্ঞার্থে বলা হয়েছে, ভাষাকে শুদ্ধভাবে জানার জন্য এবং ভাষার অশুদ্ধতা রোধে ভাষাভাষীকে সতর্ক করার জন্য বা ঋদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ব্যাকরণ। অনেকে আরও জোর দিয়ে বলেন, “ব্যাকরণ ভাষার সংবিধান”। এটি কোনোভাবে যথার্থ নয়। আমি এমন দৃষ্টিভঙ্গিকে অনেকটা জোর করে বাকস্বাধীনতা রূদ্ধ করে দেওয়ার মতো নৃসংশতার সঙ্গে তুলনা করি। ব্যাকরণকে যারাই ভাষার সংবিধান বলেছেন, তাদের আচরণই অনেক সমৃদ্ধ ভাষার মৃত্যুর জন্য দায়ী। তা যদি না-হতো তাহলে ব্যাকরণ-কঠোর সংস্কৃত ভাষা আজ মৃত কেন? কেন এককালের বিখ্যাত ল্যাটিন আজ হারিয়ে! এরূপ অনেক ভাষা ব্যাকরণ নামক কাঠোন শাসন-বিধির যাতনায় পিষ্ট হয়ে মারা গেছে। ওসব ভাষার বৈয়াকরণগণ ভাষাকে শাসন করার জন্য ব্যাকরণকে ব্যবহার করেছেন। তাদের কাছে ব্যাকরণ ছিল ভাষার সংবিধান, রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে যেমন বিধি। প্রচলিত ব্যাকরণের সংজ্ঞায় তারা ভাষাকে শাসন করতে গিয়ে ভাষা-প্রকৃতির সীমাহীন সৃষ্টিশীলতা তথা প্রাণবায়ুকে শ্বাসরোধ করে খুন করার মতো হত্যা করে ফেলেছেন। ফলে ভাষাপ্রকৃতি নির্বাক হয়ে গিয়েছে। প্রেম আর ধর্ষণ উভয়ের অন্তর্নিহিত লক্ষ্য প্রায় এক হলেও, প্রক্রিয়াটা ভিন্ন। প্রেম সৃষ্টির উল্লাসে আবেশিত, ধর্ষণ ধ্বংসের লীলায় আতঙ্কিত। ভাষাকে প্রেমিকার মতো আদরে লালন করতে হবে, ধর্ষকের মতো নৃশংসতায় নয়। তাই ব্যাকরণ হবে এমন — যেটি শাসন করবে ধর্ষকদের, ধর্ষিতকে নয়। কিন্তু প্রচলিত ব্যাকরণের সংজ্ঞায় ভাষাকে শাসনের কথা বলা হয়েছে, যা পক্ষান্তরে ভাষার সাবলীল প্রবাহের প্রতিকূল। 
তাই, আমি করি, ব্যাকরণের প্রচলিত সংজ্ঞার্থ যথার্থ নয়। তবু্ এ ভাষা টিকে আছে, শুধু প্রচলিত ব্যাকরণ-বিরোধী সৃজনশীল কিছু ভাষাভাষীর উদারতায়। রবীন্দ্রনাথ আমাদের বাংলা ভাষার ব্যাকরণের বিরুদ্ধে যদি কথা না-বলতেন, তাহলে বাংলাকে এখনও তৎসম শব্দের বিধি-কলে সে আগের মতো কঠিন নিগড়ে আটকে থাকতে হতো। তাহলে ব্যাকরণ কী? এর কি প্রয়োজনীয়তা নেই? অবশ্যই আছে এবং সে ব্যাকরণ বর্তমানে প্রচলিত সংজ্ঞার্থের বাঁধনে আবদ্ধ নয়। এটি হচ্ছে সে ব্যাকরণ যা ভাষাকে নয়, বরং ভাষাভাষীকে শাসন করবে, ভাষাভাষীকে শিক্ষা দেবে — কীভাবে ভাষাকে লালন করতে হবে, ধারণ করতে হবে, পুষ্ট করতে হবে, আদর করতে হবে; মমতা দিতে হবে মায়ের, বোনের-প্রেমিকের- প্রেমিকার। 
প্রকৃতিকে শাসন করা সম্ভব নয়, তাই ভাষাকেও শাসন করা সম্ভব নয়; কিন্তু প্রকৃতির অন্যতম কুশীলব মানুষের কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রকৃতিকে রক্ষা করা যায়; তেমন উদ্যোগে ভাষাকে ধারণ করতে হবে। আমার এ ব্যাকরণ সংজ্ঞার্থ এভাবেই সজ্জিত। প্রকৃতিকে রক্ষার জন্য একসময় প্রকৃতি-শাসন কৌশল উপযুক্ত মনে করা হতো; এখন তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তাই এখন মানুষের কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য। অতএব আমাদের ভাষাপ্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য ভাষাকে নয়, বরং ভাষার উপর ভাষাভাষীর আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে আমি ব্যাকরণের সংজ্ঞার্থকে এভাবে উপস্থাপন করতে চাই —“যে শাস্ত্র ভাষার উপর ভাষাভাষীর স্বেচ্ছাচার, শাসন ও যথেচ্ছাচার রোধ করে ভাষাপ্রকৃতিকে সর্বজনীন প্রগলভতায় উদ্দীপ্ত করার; ভাষাভাষীকে ভাষার প্রতি প্রমুগ্ধ ভালোবাসায় মোহিত করার এবং ভাষার সাবলীল সঞ্চরণ মেনে নেওয়ার মতো অভিজ্ঞানে দ্যোতিত করার উপাদনে ভূষিত- সেটিই হচ্ছে ব্যাকরণ।” 
অতএব ব্যাকরণ ভাষার গতিপ্রকৃতি নির্ধারক কোনো সংবিধান নয়, বরং ভাষাভাষীর গতিপ্রকৃতি নির্ধারক একটি বিধান। ব্যাকরণ ভাষাকে শাসন করার জন্য বরং ভাষাভাষীর আচরণকে, যারা ভাষার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক না-গড়ে, ধর্ষকের মতো উন্মত্ত আচরণ করে — তাদের সংশোধন করার জন্য।

-----------------------------------------------------------------------------------
পোস্ট : রচনা, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ইউকে।
সূত্র: ইউনিভার্সিটি অব ক্যাম্ব্রিজ, ড. মোহাম্মদ আমীন স্যারের বক্তৃতার (ব্যাকরণ : অভিজ্ঞতার দ্যোতনায় নতুন অভিধা) কিয়দংশ।

Monday, 18 July 2016

অভিধান ও বানান / ড. মোহা্ম্মদ আমীন

অনেকে মনে করেন, অভিধানে কোনো একটি শব্দের যে কয়টি বিকল্প বানান দেখা যায় সবগুলো শুদ্ধ। এ ধারণা  ঠিক নয়। যেসব শব্দ অতীতে ব্যবহৃত হতো কিন্তু এখন হচ্ছে না, বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে তবে শুদ্ধ নয় এবং শুদ্ধ ও প্রমিত- সব ধরণের শব্দ অভিধানে থাকতে পারে। অভিধান ব্যাকরণ নয়, প্রমিত রীতিও নয় এটি শব্দ ভাণ্ডার। তাই ব্যাকরণগতভাবে শুদ্ধ হোক বা অশুদ্ধ হোক সব ধরণের শব্দ অভিধানে রাখা হয়।   
যাঁরা অভিধান রচনা করেন তাঁরা বৈয়াকরণ হিসাবে অভিধান রচনা করেন না, আভিধানিক হিসাবে অভিধান রচনা করেন। পাঠক অভিধান দেখেন শব্দের অর্থ বা অর্থানুসারে বানান এবং প্রমিত বানান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য, ব্যাকরণ রীতি জ্ঞাত হওয়ার জন্য নয়।  যে সকল শব্দ প্রচলিত ছিল বা আছে সবগুলো অভিধানে না-দিলে বিভিন্ন বানানে লেখা শব্দের অর্থ-উদ্ধারে বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে। এজন্য কোনো শব্দের যতগুলো বানান প্রচলিত ছিল বা আছে তা শুদ্ধাশুদ্ধ বিবেচনা না করে অভিধানে উল্লেখ করা হয়। অতএব কেবল অভিধানভুক্তির কারণে  কোনো শব্দ শুদ্ধ বা প্রমিত হয়ে যায় না। কোনো শব্দকে প্রকৃত অর্থে শুদ্ধ হতে হলে তা ব্যাকরণগতভাবে শুদ্ধ হতে হয়। বিকল্প বিষয়টি দুর্ঘটনার জন্য রাখা হয়।  স্বাভাবিক অবস্থায় কেউ বিকল্প পন্থা গ্রহণ করে না; অজ্ঞাতা, অযোগ্যতা, অসামর্থ্যতা, দুর্যোগ প্রভৃতি কারণে বিকল্প রাখা হয়। অভিধানে বিকল্প বানান হিসেবে রাখা শব্দের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। তাই বিকল্প বানান স্বাভাবিক বানান নয়।

এবার দেখা যাক, অভিধান কী? অভিধানকে দোকানের সঙ্গে তুলনা করা যায়। পার্থক্য হচ্ছে, দোকান পণ্যভাণ্ডার এবং অভিধান  শব্দভাণ্ডার। ক্রেতাসাধারণের চাহিদা অনুযায়ী দোকানকে পণ্যসজ্জিত করা দোকানির কাজ। পণ্যের ভালোমন্দ, ক্রেতাসাধারণের লাভক্ষতি বা প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ নির্ধারণ দোকানির কাজ নয়। সময়-স্থান ও প্রচলন বা চাহিদা অনুযায়ী দোকানি যেমন পণ্য সজ্জিত করেন, তেমনি আভিধানিক সজ্জিত করেন অভিধান। এজন্য একশ বছরের আগের অভিধানের শব্দভুক্তি আর পরের অভিধানের শব্দভুক্তিতে পার্থক্য দেখা যায়। একটি দোকানে চাহিদার সব পণ্য থাকার চেয়ে না-থাকাটাই অধিক স্বাভাবিক। তাই কোনো দোকানে কাঙ্ক্ষিত পণ্যটি না-ও পাওয়া যেতে পারে।  এর মানে এই নয় যে, পণ্যটি কোথাও নেই কিংবা অস্তিত্বহীন। তেমনি, কোনো নির্দিষ্ট অভিধানে বা প্রচলিত সবকটি অভিধানেও যদি কোনো শব্দ পাওয়া না-যায়, তবু কারও এমনটি বলা সমীচীন হবে না যে, ওই শব্দটি নেই। বাংলা ভাষায় কমবেশি চার লাখের মতো শব্দ আছে। তবে এ পর্যন্ত অভিধানভুক্ত শব্দের সংখ্যা দেড় লাখের কম। তাই কোনো শব্দ কোনো অভিধানে না পেলে তা নেই কিংবা অস্তিত্বহীন বলা উচিত নয়। 
পণ্যের ভালোমন্দ বিবেচনার চেয়ে ক্রেতার চাহিদা মেটানো এবং পণ্যবিক্রি করা দোকানির মুখ্য বিষয়। ক্রেতার লাভক্ষতি কিংবা স্বাস্থ্যের উন্নতি-অবনতির দিকে নজর দেওয়া দোকানির কাজ নয়। এ কাজের জন্য নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ রয়েছে, নির্দিষ্ট আইন রয়েছে। ভাষার জন্য এই আইনটির নাম  ব্যাকরণ। দোকানে থাকা সবপণ্য যেমন ভালো হতে পারে - এমনটি নিশ্চিত করে বলা যায় না, তেমনি অভিধানে থাকা সকল শব্দ শুদ্ধ- এটিও নিশ্চিত করে বলা যায় না। সিগারেট, মদ্য, ভেজাল পণ্য কিংবা পচ খাদ্যবস্তু স্বাস্থ্যহানিকর। তবু তা দোকানে রাখা হয়, বিক্রি করা হয়। দোকানি যদি ক্রেতার স্বাস্থ্য বিবেচনায় রত হয় তাহলে ব্যবসায় লাটে উঠবে। অভিধানও ঠিক দোকানের মতো। অভিধানকে শব্দের গুদামও বলা যেতে পারে। গুদামে রাখা সব পণ্য মানসম্মত ও ভালো কিংবা স্বাস্থ্যকর তা বলা যাবে না। গুদামে ভালো-মন্দ, আংশিক ভালো, আংশিক মন্দ- সব রকমের পণ্য রাখা হয়। তাই গুদামে রাখা সব পণ্য মানসম্মত- এমনটি ভাবা যেমন সমীচীন নয় তেমনি সমীচীন নয় অভিধানে উপস্থাপিত সব শব্দ শুদ্ধ ভাবা। শব্দের শুদ্ধাশুদ্ধ বিবেচনার জন্য রয়েছে ব্যাকরণ বা ভাষা-বিধি। কোনো শব্দ উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত ব্যাকরণ রীতি অনুসরণ না করলে তা অভিধানে যতই সংরক্ষণ করা হোক না কেন, সেটি শুদ্ধ বলে গণ্য হয় না।প্রচলিত আর প্রমিত বা শুদ্ধ এক জিনিস নয়। যেমন ঈদ বানান যতই প্রচলিত হোক, প্রমিত বানান বিধি অনুযায়ী শুদ্ধ নয়। তবু অশুদ্ধ ‘ঈদ’ শব্দটিও অভিধানে পাওয়া যায়। অর্থের যোগান দেওয়ার জন্য এমন প্রচলিত শব্দ অভিধানে রাখতে হয়া। 
শুদ্ধাশুদ্ধ বিবেচনা না করে বর্তমানে প্রচলিত ও অতীতে প্রচলিত ছিল এমন সব শব্দের বানান অভিধানে রাখা অভিধান রচয়িতাগণের কর্তব্য। তাঁদের দায়িত্ব কেবল প্রচলিত শব্দের অর্থ উপস্থাপন, শুদ্ধ-অশুদ্ধ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া নয়। তবে কোনো কোনো অভিধানে শব্দের শুদ্ধ-অশুদ্ধ সম্পর্কে কিছু ধারণা উপস্থাপন করা হলেও  তা ব্যাকরণ রীতির আলোকে দেওয়া হয়। পাঠকের দায়িত্ব হচ্ছে বিচক্ষণতার সাথে প্রমিত রীতি অনুসরণ করে তা গ্রহণ-অগ্রহণ ও ব্যবহার।

সুতরাং, অভিধানে ‘কোনো শব্দের যতগুলো বানান উল্লেখ আছে সবকটি শুদ্ধ’ এমন ভাবা বিধেয় নয়। একই শব্দের একাধিক বানান উল্লেখের ক্ষেত্রে অভিধানে সাধারণত যে শব্দটি শুদ্ধ, প্রচলিত ও প্রমিত-রীতি অনুসরণ করে সেটি প্রথম লেখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে সংক্ষেপে শব্দসমূহের অবস্থানগত বিবরণও দেওয়া হয়। তবু কোন বানানটি শুদ্ধ তা অভিধানে উল্লেখ না থাকলে জানার জন্য প্রমিত রীতি সম্পর্কে অবগত থাকা সমীচীন।

কোনো বিষয়, রীতি বা কার্যক্রম জনসাধারণের কাছে যতই জনপ্রিয় বা গ্রহণযোগ্য হোক না কেন, সরকারি নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে তা বেআইনি বলে বিবেচিত হয়। অবশ্য সরকার ইচ্ছে করলে জন-চাহিদার স্বার্থে তার আইনানুগ স্বীকৃতি দিতে পারে। এভাবে আইন পরিবর্তন হয়, নতুন রীতির প্রবর্তন ঘটে। কোনো শব্দ শুধু ব্যাপক প্রচলনের কারণে যে শুদ্ধ হয়ে যাবে তা ঠিক নয়। ব্যাকরণবিধি অনুযায়ী সামঞ্জস্যপূর্ণ না-হলে অথবা বৈয়াকরণ বা ব্যাকরণ নিয়ন্ত্রণকারী উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ দ্বারা শব্দটির স্বীকৃতি না এলে তা অশুদ্ধই থেকে যাবে। এ ক্ষেত্রে বৈয়াকরণ বা ব্যাকরণ নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হচ্ছে সার্বিক বিবেচনায় বহুল প্রচলিত শব্দটির বিষয়ে তাঁদের অবস্থান দ্রুত স্পষ্ট করা। অন্যথায় তাঁরা অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন -এমনটি ভাবা যাবে না।

ভাষা বহমান নদীর মতো নয়, প্রকৃতির মতো। এর পরিবর্তন বহুমাত্রিক দ্যোতনায় অভিযোজিত হয় নানা কারণে। তাই ভাষার স্বাভাবিক প্রবাহে কোনো পক্ষের প্রতিবন্ধকতা বা বলপ্রয়োগ মঙ্গলজনক হতে পারে না। প্রেমিক বা প্রেমিকার উদ্দেশ্য এবং ধর্ষণকারীর উদ্দেশ্য অনেকটা অভিন্ন হলেও উত্তরণের পথ সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভাষাকে প্রেম দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে সাবলীল কলহাস্যে অভিষিক্ত করে বরণ করার আবহ সৃষ্টি করলে তা সর্বজনীন হয়ে উঠতে বাধ্য। কেউ যদি মাতৃভাষার প্রচলিত রীতি-নীতি আত্মস্থ করাকে কষ্টকর গণ্যে কিংবা নিজের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার অজুহাতে তা পাল্টে দিতে চেষ্টা করেন সেটি ধর্ষণের মতোই বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। প্রেমিক বা প্রেমিকাকে নিজের প্রতি প্রেমমুগ্ধ করতে না পারার কারণে তাকে জোরপূর্বক নিজের বাহুডোরে আনার চেষ্টা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি ভাষাকে শুধু আত্মস্থ করতে না পারার কারণে জটিলতার দোহাই দিয়ে ব্যাকরণের রীতিনীতি অগ্রাহ্যপূর্বক তা বদলিয়ে ফেলার কিংবা ব্যাকরণ রীতি অনুসরণে পরিবর্তনযোগ্য কোনো শব্দের পরিবর্তনকে বাধা দেওয়ার চেষ্টাও স্বেচ্ছাচারিতার নামান্তর। আর একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য যে, যারা বিদ্যমান বিষয়কে জোর করে তাড়িয়ে দিয়ে নতুন কিছু গ্রহণ করার জন্য উদগ্রীব থাকে তারা সে নতুন লভ্য বস্তুকেও দ্রুত পরিত্যাগ করার জন্য আরও বেশি উদগ্রীব হয়ে উঠে। এটি অস্থিরতার লক্ষণ। এমন কর্ম উন্নয়নের মারাত্মক অন্তরায়। মড়ার আগে কাউকে মেরে ফেলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি মড়াকে আঁকড়ে ধরাও ঠিক নয়। 
ভাষা পরিবর্তনশীল। চর্যাপদ হতে আধুনিক বাংলা ভাষার দিকে তাকালে এ পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। আমি ভাষার পরিবর্তনের বিপক্ষে নই। তবে তা হবে প্রকৃতির স্বাভাবিক পরিবর্তনের মতো সাবলীল, ভালোবাসার মতো মোহনীয়, গ্রহণের মতো মুগ্ধকর। কখনও কোনো অবস্থাতেই স্বেচ্ছাচারমূলক নয়। অতএব অভিধানে কোনো শব্দ থাকার জন্য ওই শব্দকে (বানানকে) শুদ্ধতার নজির হিসেবে উপস্থাপন আদৌ উচিত নয়।