Translate

Monday, 8 February 2016

তিলোত্তমা হাতিয়া : প্রজন্মের কণ্ঠস্বর/ ড. মোহাম্মদ আমীন

হঠাৎ এবং বলা যায় বেশ আকস্মিকভাবেই ‘তিলোত্তমা হাতিয়া’র সঙ্গে আমার পরিচয়। এটি একটি অনলাইন গ্রুপ। গ্রুপটির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক এ পরিচয় আমার কাছে নতুন দিগন্তের শুভ সূচনা,
অভিজ্ঞতার নিলয় কেতন। গ্রুপের কার্যক্রম, অ্যাডমিন প্যানেল ও সদস্যদের বিচক্ষণ দৃষ্টিভঙ্গী আমার দুটি চোখে অসংখ্য চোখের দ্যোতনা এনে দেয়। ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের মাধ্যমে সৃষ্টির যে দুরন্ত ইতিহাস ও অতলান্ত নজির গ্রুপটি তুলে ধরেছে- তা অবিশ্বাস্য বিস্ময়ে আমাকে টেনে নিয়ে যায় গ্রুপটির গভীর হতে আরও গভীরে। রাতে গ্রুপটির পোস্ট পড়া শুরু করি। পড়তে পড়তে অনেক রাত হয়ে যায়, অনেক রাত। রাতের খাওয়ার জন্য ডাকছিল, কিন্তু যেতে পারছিলাম না, উঠতে ইচ্ছে হচ্ছিল না গ্রুপ ছেড়ে। গ্রুপের পরতে পরতে জানা-অজানা শিহরিত বিষয়গুলোর বর্ণীল ছটা আমার খাদ্য ক্ষুধাকে খেয়ে ফেলে নিমিষে। অবশেষে বিরক্ত হয়ে সবাই খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। আমি পড়তে থাকি আগ্রহের সীমাহীন ভাবালুলতায়। গ্রুপ তবু শেষ হয় না, রাত শেষ হয়ে যায়। আসলে, এ গ্রুপ শেষ হওয়ার নয়। কখনও শেষ হবে না, এর জন্ম সৃষ্টির জন্য, স্বপ্নের জন্য, প্রকৃতির লাস্যে সবুজ মাঠে নদীর স্রোতের মতো রূপলী মৎস্যের চঞ্চলতা অবিকল রাখার জন্য। ‘তিলোত্তমা হাতিয়া’ চিরন্তন, শেষ হয় কীভাবে?


বস্তুত অনলাইন গাটতে গিয়ে ‘তিলোত্তমা হাতিয়া’ কথাটি দেখে থমকে গিয়েছিলাম। কারণ ছিল থমকে যাওয়ার। অনেক বছর আগে আমি হাতিয়ায় উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালীন ‘তিলোত্তমা হাতিয়া : ইতিহাস ও ঐতিহ্য” নামে একটি গ্রন্থ লিখেছিলাম। তাই ‘তিলোত্তমা হাতিয়া’ নামটি আমাকে থামিয়ে দেয়। তারপর গ্রুপের পেইজগুলো আমাকে পরম আনন্দে উদ্বেল করে রাখে। দেখতে দেখতে এবং পড়তে পড়তে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই। এ কী গ্রুপ? শুধু পেইজ? না এটি শুধু গ্রুপ নয়, লেখাগুলো শুধু লেখা নয়- জীবনের অভিধানে অনিবার্য মাধুর্য। এটি হাতিয়ার প্রতিভূ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের থাবায় থাবায় অপরাজেয় হয়ে উঠা হাতিয়ার মানুষের সংকল্প নিনাদিত উত্তর পুরুষের উত্তরদ্রোহ;  বাংলাদেশের সতের কোটি মানুষের চেতনা,  সার্বিক কল্যাণের লালিত্যে প্রেমের মাধুরী আর সৃষ্টির সৌকর্ষে দ্রোহের বহ্নিশিখা।

যতটুকু জানতে পারি, মাহবুব, শিবলু, নিশান, জুয়েল ও সুমন নামের পাঁচজন স্বপ্নাচারী কিন্তু বাস্তববাদী তরুণ প্রকৃত অর্থে প্রথমে, কোনোরূপ পরিকল্পনা ছাড়াই ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে গ্রুপটি গড়ে তুলেছিল। কয়েক দিনের মধ্যে তাদের আদর্শ, প্রতীতি ও অনিমেষ ঐকান্তিকতার মহৎ মিথষ্ক্রিয়া বিপ্লবের মতো ছড়িয়ে পড়ে। অনলাইনের কারণে তা বিদ্যুৎগতিতে চমকে উঠে। ঝঙ্কৃত করে দেয় হাতিয়া, বাংলাদেশ এবং বিশ্ব। পৃথিবীতে এখন এমন দেশ খুব
কমই আছে, যে দেশে ‘তিলোত্তমা হাতিয়া’ গ্রুপের সদস্য নেই। এমন সফলতা দেখে গ্রুপের প্রারম্ভিক অ্যাডিমনগণ উৎসাহিত হয়ে ওঠে। সংগতকারণে তারা নিজেদের আরও নিবেদিত করার প্রেরণা পায়। ফলে ‘তিলোত্তমা হাতিয়া’কে তারা  শুধু গ্রুপে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার ও চেতনার শ্বাসত বিকাশের অবিরাম আন্দোলনের যুগোপযোগী মাধ্যমে পরিণত করার উদ্যোগ নেয়। মূলত পৃথিবীর প্রত্যেক মহৎ আন্দোলনই এভাবে গড়ে উঠেছে। লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার কৌশল হিসাবে তারা ভার্চুয়াল জগতের সঙ্গে বাস্তব জগতের মিলন ঘটানোর বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ফলে ‘তিলোত্তমা হাতিয়া’ আরও গতি পায়। ভার্চুয়াল জগত নেমে আসে মাটির ধরায়। এ যেন স্বর্গ হতে মর্ত্যে দেবতার আগমন। গ্রুপের মাধ্যমে শুরু হয়ে যায় সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড। দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাতিয়ার লোকজন গ্রুপের কর্মকাণ্ডে উজ্জীবিত হয়ে উঠে। দলে দলে যোগ দিতে শরু করে অনলাইনভিত্তিক গ্রুপ ‘তিলোত্তমা হাতিয়া’র ছায়ায়।  এখন গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ছয় লাখ ১০ হাজারের অধিক এবং পরিচালক  ২৫। হাতিয়ার শিক্ষা-সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, পর্যটন, সৌন্দর্যকে মানুষের কাছে তুলে ধরাই ছিল গ্রুপের অন্যতম প্রারম্ভিক উদ্দেশ্য। এখন গ্রুপ এ উদ্দেশ্যকে ছাড়িয়ে গেছে। নিজের সঙ্গে নিজের প্রতিযোগিতা গ্রুপটিকে দিন দিন আরও বিকশিত করছে। ‘তিলোত্তমা হাতিয়া’ এখন শুধু সেবায় আনত নয়,  অন্যায়, অনিয়ম, জুলুম, নির্যাতন প্রভৃতির বিরুদ্ধেও দ্রোহের মতো সোচ্চার। ছবি আর লেখনির মাধ্যমে তুলে ধরেন সমাজের অবস্থা, নির্ভয় অবলীলায় ছুটে যান যেখানে দলিত হয় মানুষ, মথিত হয় প্রকৃতি। সবাই উদার উদারতায় ছুটে যান অসহায় মানুষের কল্যাণে, দুর্গতদের সাহায্যে। হাতিয়াকে হাতিয়ার মতো লালিত্যে উপস্থাপন করে গ্রুপটি হাতিয়ার সৌন্দর্য ঐতিহ্য ও স্বকীয়তাকে বিশ্বময় উদ্ভাসিত করে দিয়েছে। প্রাচীনকাল হতে স্বকীয় মর্যাদার অধিকারী, প্রবীণ ও বিগত হাতিয়াবাসী তাদের সন্তানদের উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গেছেন- গ্রুপটির ৬ লাখ ১০ হাজার সদস্য ও তাদের কর্মকাণ্ড এটা আবারও দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করেছে।

একটা গল্প বলি, না, গল্প নয় ঘটনা। জনৈক কাউসার কয়েক বছর যাবত কানের সমস্যায় ভুগছিলেন।অপারেশন জরুরী হয়ে পড়েছিল। খবর নিয়ে জানতে পারেন জাতীয় নাক,কান ও গলা ইনস্টিটিউটের  পরিচারক ডাঃ জাহিদুল আলম  হাতিয়ার'ই সন্তান।কিন্তু তিনি কোনভাবেই পরিচালক সাহেবের সাথে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছিলেন
না। তখন কাউসার "তিলোত্তমা হাতিয়া" গ্রুপের  সাহায্য চেয়ে পোস্ট করেন। এরপর কী ঘটেছে তা কাউসারের জবানিতে শোনা যাক : আমার পোস্ট দেখে সেদিন অনেকেই অনেক ভাবে আমার দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বিশেষ করে "তিলোত্তমা হাতিয়া”র অ্যাডমিন প্যানেল থেকে নিশান ভাই, শিবলু ভাই, জুয়েল ভাই, সাঈফ ভাইসহ অনেকেই। কেউ ঠিকানা দিয়ে, কেউ ফোন নাম্বার দিয়ে, কেউ রেফারেন্স দিয়ে আমাকে সহযোগিতা করেছেন। সত্যি বলতে কি আমি কখনও ভাবতেই পারিনি এই গ্রুপের সদস্যরা এতটা আন্তরিকভাবে আমার দিকে এগিয়ে আসবেন।” তিলোত্তমা হাতিয়া গ্রুপের সহায়তায় কাউসারের অপারেশন এমনভাবে  সম্পন্ন হয় যেন, গ্রুপের সব অ্যাডমিনই তার নিকটাত্মীয়। তাদের আন্তরিকতায় মুগ্ধ কাউসারের আবেগময় প্রকাশ : "ফেসবুকের কোটি কোটি গ্রুপের মধ্যে ‘তিলোত্তমা হাতিয়া’ আমার দেখা সবচেয়ে আন্তরিক গ্রুপ"।
 
কী নেই এ গ্রুপে? সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, ঐতিহ্য, প্রকৃতি, পরিবেশ, নৈতিকতা, সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্র, জাতি, দেশ, মাটি, নদী, প্রাত্যহিক জীবনের স্বাদ-বিস্বাদ, সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্খা, দলিত মানুষের হাসি-কান্না, শোষক শ্রেণির চরিত্র, রাজনীতির কুটিলতা, লোভীদের হায়েনাপনা, ভালো মানুষের ভালবাসা, মন্দ লোকের হীনম্মন্যতা- সব আছে। এখানে সবকিছু মিলেমিশে অথচ অদ্ভুদ কৌশলে পৃথক অবয়বে আপন স্থানে বিপুল আশার বাণী হয়ে ছড়িয়ে, মাতিয়ে, নাড়িয়ে এবং এগিয়ে। নামে গ্রুপ হলেও ‘তিলোত্তমা হাতিয়া’ প্রকৃতপক্ষে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের কোলে নির্যাস বৈশ্বিকতার চিরন্তন আলাপ যেন। এটি অতীত হয়ে সুদূর ভবিষ্যতের বিদুর সেতুবন্ধন। ফলে এর বিদ্যমানতা সর্বত্র - শিল্পের নান্দনিকতা হতে শুরু করে কৃষকের লাঙ্গলে আর কুলবধূর কলসী হতে দুর্গতদের ভাঙ্গা নীড়ে।

‘তিলোত্তমা হাতিয়া’র ছয় লাখ দশহাজারের অধিক সদস্য। সংখ্যাটি হাতিয়ার জনসংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। তার মানে বাংলাদেশের শিক্ষিত ও সচেতন জনগোষ্ঠীর একটি বৃহদংশ এ গ্রুপের সঙ্গে জড়িত।
দেশপ্রেমের দৃঢ়কঠিন অঙ্গীকারে গ্রুপটি অনল প্রত্যয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। ঐতিহ্য তাদের স্তম্ভ হয়ে অনাগত দিনকে স্বপ্নীল মায়ায় প্রশান্তময় করে তুলতে বিভোর। হাতিয়ার প্রতি তাদের ঐকান্তিক ভালবাসার মৃণ্ময় দায়বদ্ধতা গ্রুপটির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। হাতিয়াকে তারা ভালবাসে প্রাণের চেয়েও, তাদের এ ভালবাসা নিঝুম দ্বীপের হরিণ চকিত আখির তড়িৎ চাঞ্চল্য হয়ে হাতিয়ার সবুজ প্রান্তরকে অন্তর করে, সারা বাংলাদেশে রক্তিম আবেগের বন্যা এনে দিয়েছে, উল্লাস বিলাসে। সালাহউদ্দিন আহমেদের ভাষায় :

“এই আমার সবুজ শ্যামল গ্রাম এই আমার বাংলা।
গ্রামের সবুজ-শ্যামল নয়নাভিরাম দৃশ্য না দেখলে অস্থির হয়ে পড়ি,
ধন্য আমি ধন্য এমন একটি গ্রামে আমার জম্ম.........”

যেদিক দিয়ে বিবেচনাকেরা হোক না কেন, নিঃসন্দেহে ‘তিলোত্তমা হাতিয়া’ অসাধারণ ও ব্যতিক্রমধর্মী একটি অনলাইন গ্রুপ। যে গ্রুপটি অনলাইন হতে মানুষের অন্তরের গভীরতায় স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে, সে গ্রুপটির পক্ষে যে কোনো কিছু করা সম্ভব। এটি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি উদহারণ হয়ে থাকবে। ‘তিলোত্তমা হাতিয়া’ ভার্চুয়াল হলেও কাউসারের চিকিৎসা, দূর্গতদের সাহায্য, অসুস্থদের সেবা, শীতার্তদের বস্ত্রদান
কোনোটাই ভার্চুয়াল নয়। এর প্রতিটি সত্যের মতো নিরেট এবং জীবনের মতো বাস্তব। ভার্চুয়াল জগতকে বাস্তব জগতে নিয়ে এসে মানুষের সেবা করার এমন জলন্ত প্রমাণ যে গ্রুপটি রাখতে পারে – সেটি কত কার্যকর একটি গ্রুপ তা সহজে অনুমেয়। আমার জানামতে, বাংলাদেশে এমন গ্রুপের সংখ্যা খুব কম, নেই বললেই চলে। তাই ‘তিলোত্তমা হাতিয়া’ অনলাইন গ্রুপ মাত্র নয়; এটি একটি আন্দোলন, একটি বিপ্লব এবং জনপদের প্রাগ্রসর একদল মহীয়ান তরুণের স্বপ্ন-মঞ্জরির স্বপ্ন-শিরা বেয়ে বাস্তবে নেমে আসা সীমাহীন কল্যাণের দৃঢ় প্রত্যয়।
একটি বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা আবশ্যক। গ্রুপে অনেক পোস্টে শব্দের বানানে ভুল পরিলক্ষিত হয়। এটি একটি অনেক বড় গ্রুপ। এতবড় একটি গ্রুপের প্রভাব অনেক বেশি। তাই শব্দের
প্রমিত বানানে আরও গভীরভাবে নজর দেওয়া প্রয়োজন। আর একটি বিষয় হচ্ছে পোস্ট। কিছু কিছু পোস্ট ও ছবি গ্রুপে  রয়েছে, যা গ্রুপের উদ্দেশ্য, প্রভাব ও বৃহত্তর পরিসর বিবেচনায় অনুমোদন করা সমীচীন মনে হয়নি। এ বিষয়টির প্রতিও সচেতন থাকা প্রয়োজন। কারণ, এখানে একটি ভুল বানান কিংবা একটি অপ্রাসঙ্গিক পোস্ট ছয় লক্ষাধিক মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। মনে রাখা প্রয়োজন, তিলোত্তমা হাতিয়া’ এখন একটি প্রচণ্ড প্রভাবশালী গ্রুপ। তাই তাদেরকে অবশ্যই বানান যাতে ভুল না-হয় এবং পোস্ট যাতে গ্রুপের মতোই মানসম্মত হয় সেটি মাথায় রেখে কাজ করতে হবে।

পরিশেষে, আমি এ গ্রুপের অ্যাডমিন প্যানেল, সদস্য, শুভাকাঙ্খী এবং সর্বোপরি এত বড় একটি গ্রুপ সৃষ্টিতে ও তাদের লক্ষ্যপূরণের কর্মযজ্ঞে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছেন ও করেছেন সবার ভূয়শী প্রশংসা করছি। ‘তিলোত্তমা হাতিয়া’ আরও তিলোত্তম হয়ে উঠবে- এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।


লেখক পরিচিতি : উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, সাহিত্যিক, গবেষক, ভাষাবিদ, ইতিহাসবেত্তা ও জীবনীকার।

Sunday, 31 January 2016

ড. মোহাম্মদ আমীন : বাংলা সাহিত্যের একনিষ্ঠ সাধক / মো: আব্দুস সালাম খান

মোহাম্মদ আমীনের চকরিয়ার ইতিহাস  অভয়নগরের ইতিহাস গ্রন্থে যে সকল চমৎকার তথ্য লিপিবদ্ধ হয়েছে, তা পড়ে মুগ্ধ হতে হয়। পুঁটি মাছের মুখ দিয়ে  “ পৃথিবীতে একমাত্র  মানুষই  নিজের  মলমূত্র খায়”  বলিয়ে যেভাবে মানুষের বিবেককে জাগিয়ে  তুলতে চেষ্টা করা হয়েছে তাতে স্যানিটেশন সম্পর্কে মানুষ মানুষ  সচেতন  না হয়ে পারে না। তার গ্রন্থসমূহে অতীতকে  জানার এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ  রচনার জন্য  মানব  সমাজকে সাহায্য করবে  বলে আমি বিশ্বাস করি। সাহিত্য চর্চায় তার মেধা ও শ্রম কাজে লাগিয়ে মানব কল্যাণে তিনি আরও ব্রতী হবেন- এটাই আমাদের প্রত্যাশা। তার সাধানা তাকে খ্যাতির উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করবে এটাই কামনা করি।
জনাব আমীনের লেখা  ‘বনমামলা দায়ের ও পরিচালনার কৌশল’ এবং ‘ম্যাজিস্ট্রেসি ও আদেশনামা’ বইদুটো আমাদের সহকর্মীদের দৈনন্দিন কর্তব্যপালনে উপকারে আসবে। বই দুটো প্রশাসনে নিয়োজিত উদীয়মান কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি কার্যক্রমে আরও সুদক্ষ করে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি। জনাব মোহাম্মদ আমীন আমাদের গর্ব। আমি তার চমৎকার লেখার প্রশংসা করছি। তার এ কর্ম প্রচেষ্টা অন্যদেরকে বই লিখতে অনুপ্রাণিত করবে।
কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জনাব আমীনের সাহিত্য চর্চায় আমি মুগ্ধ। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ম্যাজিস্ট্রেসির পাশাপাশি সাহিত্য চর্চা করে বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন। ‘তিলোত্তমা হাতিয়া’ যিনি লিখেত পারেন তার পক্ষে বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন লাভ করা অসম্ভব নয়। তার জন্য আমি গর্ববোধ করি।

লেখক : মো: আব্দুস সালাম খান, প্রাক্তন সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও  রেক্টর, বিপিএটিসি, সাভার, ঢাকা ও প্রাক্তন জেলাপ্রশাসক, চট্টগ্রাম।

ড. মোহাম্মদ আমীনের চোখে আহমদ ছফা / সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস

 পশ্চিমবঙ্গ হতে ড. মোহাম্মদ আমীনের কাছে লেখা সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাসের চিঠি
প্রিয় মোহাম্মদ আমীন সাহেব 
আশা করি ভালো আছেন। আপনার লেখা ‘আহমদ ছফার চোখে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী’ বইটা পড়লাম। সকাল দশটায় বইটায় একটু চোখ বুলানোর জন্য হাতে নিয়ে বিছানায় বসলাম। হাতে কিছু অন্য কাজও ছিল। কিন্তু অন্য কাজ আর হলো না। দুপুর দুটা নাগাদ বইটা শেষ করে তারপর স্নান করতে গেলাম। কী যে ভালো লাগলো! তা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।মনটা যেন প্রশান্তিতে ভরে গেল।  
বর্ডারের ঝামেলার কথা মনে করে মাত্র দুই সেট বই নিয়ে গিয়েছিলাম বাংলাদেশে। তার এক সেট আপনাকে দিয়ে দিই। পরে অনেকে বই চেয়েছেন দিতে পারিনি।একবাই বোধহয় ভেবেছিলাম, তাঁকে বই দুটো না দিলেই ভালো হতো। কারণ সাধারণত সরকারি কর্তাব্যক্তিরা বইপত্র তেমন পড়েন না। যত বড় কর্তা হন, বই পড়ার হার তত কমে যায়। এখন বুঝতে পারছি- আমার ওই ছাইটুক না দিলে এই ‘সোনার তাল’ কোনোদিনই হয়তো বা পেতাম না। আহমদ ছফা হয়তো বা আমার অজানাই থেকে যেতেন।  
আমি সাহিত্যের ছাত্র নই। সাহিত্য বুঝি না, সাহিত্যিকদের চিনি না তেমন। এপার বা ওপার বাংলার সাহিত্যিক ও তাদের সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে তেমন কোনো পরিচয় নেই। যতদূর মনে পড়ে ওপার বাংলার সাহিত্যকর্মের সাথে পরিচয় বলতে -ইলিয়াস সাহেবের ‘খোয়াবনামা’, অন্য কোনো এক লেখকের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ এমন এক আধটু। আহমদ ছফা সাহেবের সৃষ্টি সাথে পরিচয় না ঘটা তাই আমার ক্ষেত্রে অগৌরবের হলেও অস্বাভাবিক নয়।  
আপনি লিখেছেন ‘আহমদ ছফার চোখে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী’ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমি পেলাম ‘ আপনার চোখে আহমদ ছফা’।আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ! বেনিয়া গোষ্ঠীর কবল থেকে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির মুক্তিসংগ্রাম! উহ্- এ আর এক মহান যুদ্ধের সুতীব্র আহবান। আহমদ ছফার সাহিত্য সৃষ্টির সাথে আমার এখনও পরিচয় ঘটেনি। কিন্তু সেটা কোনো বিষয় নয়। আনন্দবাজার গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রনমুক্ত হবার যে দিক্‌নির্দেশনা তিনি দিয়েছেন, তাতেই তাঁর চিন্তার শ্রেষ্ঠত্ব ও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়।  
‘আহমদ ছফার চোখে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী’ গ্রন্থ পাঠ করার পর বুঝতে কষ্ট হয় না যে, আহমদ ছফা একজন বিদ্রোহী ও প্রতিবাদী চরিত্র। আপনার বইয়ে তাঁর যে তেজ, যে আদর্শ, যে সাহস এবং যে নির্লোভ দৃঢ়তা প্রকাশ হয়েছে তা দলিত মানুষের জন্য  একটি বড় সুখবর। কিন্তু এ বই থেকে পরিষ্কার হলো না - তিনি কোনো স্বতন্ত্র সাহিত্যধারার সৃষ্টি ও প্রতিষ্ঠা করতে পারলেন কি না; যা একান্তই প্রয়োজন। 
পশ্চিম বাংলায় একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যধারার আন্দোলন শুরু হয়েছে। যা ‘দলিত সাহিত্য আন্দোলন’ নামে পরিচিত। প্রচলিত সাহিত্য বা আনন্দবাজারী সাহিত্যকে তারা ‘ব্রাহ্মন্যবাদী সাহিত্য’ নামে চিহ্নিত করে। দলিত সাহিত্য, ব্রাহ্মন্যবাদী শিল্প-সাহিত্যকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে দলিত, গরিব এবং প্রান্তিক মানুষের জীবন সংগ্রাম, তাদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও চিন্তাকে উপজীব্য করে তাদের বিকাশের জন্য সাহিত্য সৃষ্টি করে। দলিত সাহিত্য নিছক কোনো সাহিত্য কর্ম নয়; এটি হলো একটি আন্দোলন-- সময় বদলের সংগ্রাম। তাদের সংগঠন ‘বাংলা দলিত সাহিত্য সংস্থা’ এবং তাদের মুখপত্র ‘চতুর্থ দুনিয়া’(তৃতীয় বিশ্বে দলিতরা অন্য আর এক জাতের মানুষ)। 
মনে হচ্ছে আহমদ ছফা সৃষ্টি করেছেন একটি স্ফুলিঙ্গ- য দিয়ে দাবানল তৈরি হতে পারে। সে গুরুদায়িত্ব আপনাদের। ‘আহমদ ছফার চোখে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী’ গ্রন্থের মাধ্যমে তা আপনারা অতি সাহসের সঙ্গে দাবানলের মতো ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়েছেন । আহমদ ছফাকে অনুসরণ করে যদি একটি স্বতন্ত্র সাহিত্য-সংস্কৃতির আন্দোলন আপনারা গড়ে তুলতে ও বাঁচিয়ে রাখতে না পারেন, তাহলে ছফা একদিন হয়তো বা হারিয়ে যাবেন, তাতে সমাজ বদলের সংগ্রাম আরও দীর্ঘায়িত হয়ে যাবে। 
আহমদ ছফাকে নিয়ে যিনি লেখেন, সেই লেখার মধ্যে আহমদ ছফার সাথে লেখককেও খুঁজে পাওয়া যায়। লেখকের সত্ত্বায় যদি আহমদ ছফা মিশে না থাকতেন, তাহলে এমন প্রাণবন্ত ছফাকে খুঁজে পাওয়া যেত না। অসম্ভব ভালো আপনার অনুভূতি, সুউচ্চ আপনার মূল্যবোধ, সুতীক্ষ্ণ আপনার কলম।আহমদ ছফার কথাকে ঠিক আহমদ ছফার মতো অগ্নিস্বরে আপনার কলম দিয়ে বের করেছেন।  
মনে হচ্ছে আপনার বইয়ে কোনো এক জায়গার ‘চৈতন্য দেব’ এর উল্লেখ করেছেন। তিনি নমস্য, তাঁকে নমস্কার জানিয়ে আপনাকে অনুরোধ করব, ‘হরি গুরু চাঁদ’ এর খোঁজ নিন একটু। জন্ম গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে। আমার লেখা বইয়ে ‘গ্রাম বাংলার রেনেসাঁর জনক গুরুচাঁদ ঠাকুর’ শিরোনামে একটা লেখায় তাঁর প্রাথমিক পরিচয় পাবেন। আমার বিশ্বাস আপনি চেষ্টা করলে আপনার কলমের আঁচড়ে তাঁরা প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারবেন। 
আমার জন্ম মশিয়াহাটিতে। ২০ বছর বয়স পর্যন্ত সেখানে কেটেছে। তারপর একান্ত অনিচ্ছায় ভারতে বন্দি হয়ে আছি। পালাবার পথ করে উঠতে পারিনি কিন্তু পালাবার ইচ্ছা এখনও শেষ হয়ে যায়নি।মনে হয়, ওই মাটি (বাংলাদেশের) আপনাদের থেকেও আমার বেশি প্রিয়। দীর্ঘ বিরহে প্রেমাকর্ষণ যেন বেড়েই চলেছে। খুব তাড়াতাড়ি ্আবার মশিয়াহাটি (যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলার একটি গ্রাম) যাবার ইচ্ছা আছে।  
দেখুন, সাহিত্য, সাহিত্যমূল্য এসব বুঝি না। আমি ‘লিফলেট’ লেখা মানুষ। তাই, মনের কথাগুলো ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারলাম না। আপনার বীরপ্রতীক পিতামহ -- ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিযোদ্ধার ডায়েরি থেকে উদ্ধার করার মতই একটু কষ্ট করে আমার আনন্দ ও উচ্ছ্বাস যদি বুঝে নেন, কৃতজ্ঞ থাকব।   
আপনার লেখা ‘আহমদ ছফার চোখে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী’ গ্রন্থটা পড়ে আমি নতুন আলোর আগমন টের পাচ্ছি। তাই আপনার মাধ্যমে ‘বাংলা দলিত সাহিত্য সংস্থা’র একজন কর্মী হিসাবে বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিক ও প্রাগ্রসর প্রজন্মকে আহমদ ছফার মতো দৃঢ় মনোবল নিয়ে স্বতন্ত্র সাহিত্য-সংস্কৃতির আন্দোলনকে দাবানলের মতো ছড়িয়ে দিয়ে অসাম্প্রদায়িক মনোভাবে উজ্জীবিত ও দলিতের কল্যাণে নিবেদিত একটি সার্বজনীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসার আহবান জানাচ্ছি। যেখানে থাকবে না কোনো ভেদাভেদ, দলিত মানুষের হাহাকার, বঞ্চিতের চীৎকার। 
ধন্যবাদসহ,
আপনার গুণমুগ্ধ
সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস নতুন পল্লী, মছলন্দপুর উত্তর চব্বিশ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

ড. মোহাম্মদ আমীনের চোখে আহমদ ছফা / সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস

 পশ্চিমবঙ্গ হতে ড. মোহাম্মদ আমীনের কাছে লেখা সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাসের চিঠি
প্রিয় মোহাম্মদ আমীন সাহেব 
আশা করি ভালো আছেন। আপনার লেখা ‘আহমদ ছফার চোখে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী’ বইটা পড়লাম। সকাল দশটায় বইটায় একটু চোখ বুলানোর জন্য হাতে নিয়ে বিছানায় বসলাম। হাতে কিছু অন্য কাজও ছিল। কিন্তু অন্য কাজ আর হলো না। দুপুর দুটা নাগাদ বইটা শেষ করে তারপর স্নান করতে গেলাম। কী যে ভালো লাগলো! তা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।মনটা যেন প্রশান্তিতে ভরে গেল।  
বর্ডারের ঝামেলার কথা মনে করে মাত্র দুই সেট বই নিয়ে গিয়েছিলাম বাংলাদেশে। তার এক সেট আপনাকে দিয়ে দিই। পরে অনেকে বই চেয়েছেন দিতে পারিনি।একবাই বোধহয় ভেবেছিলাম, তাঁকে বই দুটো না দিলেই ভালো হতো। কারণ সাধারণত সরকারি কর্তাব্যক্তিরা বইপত্র তেমন পড়েন না। যত বড় কর্তা হন, বই পড়ার হার তত কমে যায়। এখন বুঝতে পারছি- আমার ওই ছাইটুক না দিলে এই ‘সোনার তাল’ কোনোদিনই হয়তো বা পেতাম না। আহমদ ছফা হয়তো বা আমার অজানাই থেকে যেতেন।  
আমি সাহিত্যের ছাত্র নই। সাহিত্য বুঝি না, সাহিত্যিকদের চিনি না তেমন। এপার বা ওপার বাংলার সাহিত্যিক ও তাদের সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে তেমন কোনো পরিচয় নেই। যতদূর মনে পড়ে ওপার বাংলার সাহিত্যকর্মের সাথে পরিচয় বলতে -ইলিয়াস সাহেবের ‘খোয়াবনামা’, অন্য কোনো এক লেখকের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ এমন এক আধটু। আহমদ ছফা সাহেবের সৃষ্টি সাথে পরিচয় না ঘটা তাই আমার ক্ষেত্রে অগৌরবের হলেও অস্বাভাবিক নয়।  
আপনি লিখেছেন ‘আহমদ ছফার চোখে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী’ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমি পেলাম ‘ আপনার চোখে আহমদ ছফা’।আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ! বেনিয়া গোষ্ঠীর কবল থেকে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির মুক্তিসংগ্রাম! উহ্- এ আর এক মহান যুদ্ধের সুতীব্র আহবান। আহমদ ছফার সাহিত্য সৃষ্টির সাথে আমার এখনও পরিচয় ঘটেনি। কিন্তু সেটা কোনো বিষয় নয়। আনন্দবাজার গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রনমুক্ত হবার যে দিক্‌নির্দেশনা তিনি দিয়েছেন, তাতেই তাঁর চিন্তার শ্রেষ্ঠত্ব ও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়।  
‘আহমদ ছফার চোখে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী’ গ্রন্থ পাঠ করার পর বুঝতে কষ্ট হয় না যে, আহমদ ছফা একজন বিদ্রোহী ও প্রতিবাদী চরিত্র। আপনার বইয়ে তাঁর যে তেজ, যে আদর্শ, যে সাহস এবং যে নির্লোভ দৃঢ়তা প্রকাশ হয়েছে তা দলিত মানুষের জন্য  একটি বড় সুখবর। কিন্তু এ বই থেকে পরিষ্কার হলো না - তিনি কোনো স্বতন্ত্র সাহিত্যধারার সৃষ্টি ও প্রতিষ্ঠা করতে পারলেন কি না; যা একান্তই প্রয়োজন। 
পশ্চিম বাংলায় একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যধারার আন্দোলন শুরু হয়েছে। যা ‘দলিত সাহিত্য আন্দোলন’ নামে পরিচিত। প্রচলিত সাহিত্য বা আনন্দবাজারী সাহিত্যকে তারা ‘ব্রাহ্মন্যবাদী সাহিত্য’ নামে চিহ্নিত করে। দলিত সাহিত্য, ব্রাহ্মন্যবাদী শিল্প-সাহিত্যকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে দলিত, গরিব এবং প্রান্তিক মানুষের জীবন সংগ্রাম, তাদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও চিন্তাকে উপজীব্য করে তাদের বিকাশের জন্য সাহিত্য সৃষ্টি করে। দলিত সাহিত্য নিছক কোনো সাহিত্য কর্ম নয়; এটি হলো একটি আন্দোলন-- সময় বদলের সংগ্রাম। তাদের সংগঠন ‘বাংলা দলিত সাহিত্য সংস্থা’ এবং তাদের মুখপত্র ‘চতুর্থ দুনিয়া’(তৃতীয় বিশ্বে দলিতরা অন্য আর এক জাতের মানুষ)। 
মনে হচ্ছে আহমদ ছফা সৃষ্টি করেছেন একটি স্ফুলিঙ্গ- য দিয়ে দাবানল তৈরি হতে পারে। সে গুরুদায়িত্ব আপনাদের। ‘আহমদ ছফার চোখে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী’ গ্রন্থের মাধ্যমে তা আপনারা অতি সাহসের সঙ্গে দাবানলের মতো ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়েছেন । আহমদ ছফাকে অনুসরণ করে যদি একটি স্বতন্ত্র সাহিত্য-সংস্কৃতির আন্দোলন আপনারা গড়ে তুলতে ও বাঁচিয়ে রাখতে না পারেন, তাহলে ছফা একদিন হয়তো বা হারিয়ে যাবেন, তাতে সমাজ বদলের সংগ্রাম আরও দীর্ঘায়িত হয়ে যাবে। 
আহমদ ছফাকে নিয়ে যিনি লেখেন, সেই লেখার মধ্যে আহমদ ছফার সাথে লেখককেও খুঁজে পাওয়া যায়। লেখকের সত্ত্বায় যদি আহমদ ছফা মিশে না থাকতেন, তাহলে এমন প্রাণবন্ত ছফাকে খুঁজে পাওয়া যেত না। অসম্ভব ভালো আপনার অনুভূতি, সুউচ্চ আপনার মূল্যবোধ, সুতীক্ষ্ণ আপনার কলম।আহমদ ছফার কথাকে ঠিক আহমদ ছফার মতো অগ্নিস্বরে আপনার কলম দিয়ে বের করেছেন।  
মনে হচ্ছে আপনার বইয়ে কোনো এক জায়গার ‘চৈতন্য দেব’ এর উল্লেখ করেছেন। তিনি নমস্য, তাঁকে নমস্কার জানিয়ে আপনাকে অনুরোধ করব, ‘হরি গুরু চাঁদ’ এর খোঁজ নিন একটু। জন্ম গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে। আমার লেখা বইয়ে ‘গ্রাম বাংলার রেনেসাঁর জনক গুরুচাঁদ ঠাকুর’ শিরোনামে একটা লেখায় তাঁর প্রাথমিক পরিচয় পাবেন। আমার বিশ্বাস আপনি চেষ্টা করলে আপনার কলমের আঁচড়ে তাঁরা প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারবেন। 
আমার জন্ম মশিয়াহাটিতে। ২০ বছর বয়স পর্যন্ত সেখানে কেটেছে। তারপর একান্ত অনিচ্ছায় ভারতে বন্দি হয়ে আছি। পালাবার পথ করে উঠতে পারিনি কিন্তু পালাবার ইচ্ছা এখনও শেষ হয়ে যায়নি।মনে হয়, ওই মাটি (বাংলাদেশের) আপনাদের থেকেও আমার বেশি প্রিয়। দীর্ঘ বিরহে প্রেমাকর্ষণ যেন বেড়েই চলেছে। খুব তাড়াতাড়ি ্আবার মশিয়াহাটি (যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলার একটি গ্রাম) যাবার ইচ্ছা আছে।  
দেখুন, সাহিত্য, সাহিত্যমূল্য এসব বুঝি না। আমি ‘লিফলেট’ লেখা মানুষ। তাই, মনের কথাগুলো ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারলাম না। আপনার বীরপ্রতীক পিতামহ -- ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিযোদ্ধার ডায়েরি থেকে উদ্ধার করার মতই একটু কষ্ট করে আমার আনন্দ ও উচ্ছ্বাস যদি বুঝে নেন, কৃতজ্ঞ থাকব।   
আপনার লেখা ‘আহমদ ছফার চোখে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী’ গ্রন্থটা পড়ে আমি নতুন আলোর আগমন টের পাচ্ছি। তাই আপনার মাধ্যমে ‘বাংলা দলিত সাহিত্য সংস্থা’র একজন কর্মী হিসাবে বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিক ও প্রাগ্রসর প্রজন্মকে আহমদ ছফার মতো দৃঢ় মনোবল নিয়ে স্বতন্ত্র সাহিত্য-সংস্কৃতির আন্দোলনকে দাবানলের মতো ছড়িয়ে দিয়ে অসাম্প্রদায়িক মনোভাবে উজ্জীবিত - একটি সার্বজনীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসার আহবান জানাচ্ছি। যেখানে থাকবে না কোনো ভেদাভেদ, দলিত মানুষের হাহাকার, বঞ্চিতের চীৎকার। 
ধন্যবাদসহ,
আপনার গুণমুগ্ধ
সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস নতুন পল্লী, মছলন্দপুর উত্তর চব্বিশ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।


Monday, 25 January 2016

মা নাকি বউ / ড. মোহাম্মদ আমীন


অক্সফোর্ডে MS এর বিষয় ছিল Impact of marriage on Person and Family. শিক্ষার্থী ৪৯ জন প্রথম ক্লাশের ঘটনা। শিক্ষক প্রত্যেকের হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিলেন। লেখা ছিল : আপনার কাছে একটি একটি খাবারের প্যাকেট আছে । ওটি দুজনের যে কোনো একজনকে দিতে হবে। ওই দুজনের মধ্যে্ একজন তোমার মা এবং অন্যজন সদ্য-বিবাহিতা স্ত্রী। প্রশ্ন হচ্ছে বস্তুটি তুমি কার হতে তুলে দেবে? 
সময় ছিল মাত্র দুই সেকেন্ড।শিক্ষার্থীরা জবাব লিখে শিক্ষকের হাতে ‍তুলে দিলেন। তিনি কাগজগুলো পড়ে বললেন : যারা প্যাকেটটি মায়ের হাতে তুলে দেওয়ার কথা লিখেছেন, তারা বাস্তবতা বিবর্জিত, অতিমাত্রায় আবেগপ্রবণ, পশ্চাৎপদ, অদূরদর্শী, বোকা, স্বার্থপর, অপরিনামদর্শী, মায়ের অকল্যাণকামী, সর্বোপরি নিজের, পরিবারের ও সমাজের সঙ্গে সুন্দর সেতুবন্ধন রচনায় বিচক্ষণ নয়। যারা মা-কে প্রকৃত অর্থে ভালবাসে তারা কখনও প্যাকেটটি মায়ের হাতে তুলে দেবে না।কয়েকজন প্রশ্ন করলেন : কেন?শিক্ষক : দেখ, প্যাকেটটা তোমার মাকে দিলে তিনি খুশি হবেন কিন্তু বউকে দিলে তিনি আরও বেশি খুশি হবেন। বউ ভাববেন, নিজের জন্মদত্রীকে না-দিয়ে আমাকে দিয়েছে। আমার স্বামী আমাকে খুব ভালবাসেন। তিনি আপনার প্রতি আরও অনুরক্ত হবেন। মা ভাববেন, আমার ছেলে, দশমাস পেটে রেখেছি, লালন করেছি; আমাকে না দিয়ে কী বউকে দেবে? বউ ভাববেন ভালবাসা, মা ভাববেন কর্তব্য।বউকে দিলে মা কষ্ট পাবেন সত্য, কিন্তু তোমার সংসার করতে হবে বউয়ের সঙ্গে, মায়ের সঙ্গে নয়। তোমার মাকে অধিকাংশ সময় পুত্রবধূর সঙ্গে কাটাতে হবে। তুমি যদি প্যাকেটা বউকে দাও সে খুশিতে আপ্লুত হয়ে ওঠবে। খুশিতে আপ্লুত বউ বস্তুটা তোমার মায়ের হাতে তুলে দিয়ে বলতে পারেন : মা, আপনার ছেলের উপহার, আপনি রাখুন, দেখুন কী দিয়েছে আপনার ছেলে। আর যদি মাকে দাও, বউ খুব কষ্ট পাবে। ওই কষ্ট তাকে ঈর্ষাপরায়ণ ও হিংস্র করে তুলতে পারে। যা ক্রমশ আপনাদের মধ্যে সৃষ্টি করতে পারে দূরত্ব, অবিশ্বাস আর ভালবাসাহীনতা।
মায়ের হাতে তুলে দিলে বউ ভাববেন, না-জানি কী মূল্যবান বস্তু প্যাকেটে আছে। এটা আমাকে পেতেই হবে। স্বামী আমাকে ভালবাসে না। যত ভালবাসা মায়ের প্রতি। আমি পরের মেয়ে তাই এত অবহেলা। এবার বুড়ির মজা দেখাব। এ অবস্থায়, বউ স্বামীর অবর্তমানে শাশুড়ীকে মানসিক অশান্তিতে জর্জরিত করে তুলতে পারেন। অধিকন্তু তুমি মা-কে প্যাকেটটা দিলেও তোমার মা রাখতে পারবেন না। বউ ওই বস্তুটা কোনো এক ফাঁকে সুযোগ বুঝে জোর করে বা কৌশলে নিয়ে নেবেন। সংসারে শুরু হবে অশান্তি, জীবন অতীষ্ঠ হয়ে ওঠবে, এমনকি মায়ের অবর্তমানেও তোমাকে খোচা দেবে।মাকে বউয়ের সেবায় সংসারকে আনন্দময় করে তুলতে হলে বউয়ের হাত দিয়ে মায়ের উপহার দিন। কারণ, মা যতটুকু সহ্য করতে পারবেন, মেনে নিতে পারবেন- বউ তত পারবেন না। কম বয়সী মেয়েরা অভিমানী হন, তারা ভালবাসা ছাড়া কিছু বুঝেন না। বাস্তবতাকে আবেগ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে বলে সংসারে অশান্তি আসে। তাই প্যাকেটটা মায়ের হাতে দিলে তিনি তার সামান্য সুফলও পাবেন না। কিন্তু বউয়ের হাত দিয়ে মাকে দিলে অন্তত সামান্য হলেও সুফল পাবেন।একজন শিক্ষার্থী বললেন : বউ যদি মাকে পুরো বঞ্চিত করেন?সাধারণত করেন না। কারণ, বউ আপনার মাকে বঞ্ছিত করে আপনার বিরাগভাজন হবেন না। যদি কেউ করেন, সেটি হবে ব্যতিক্রম। ব্যতিক্রম উদাহরণ হতে পারে না। গবেষণায় এমনটি দেখা যায়নি।তোমাদের হয়তো অনেকের জানা আছে, সম্রাট আকবরের দরবারে আগত এক অতিথি রাজাকে পানের বাটা তুলে দেওয়ার গল্প! পানের বাটাধারী এসে দ্বন্ধে পড়ে গেলেন। কার হতে তুলে দেবেন বাটা। রাজার দিলে সম্রাট ভাববেন, আমার খায, আমার পরে, সে কিনা আমার অধীন সামান্য এক রাজার কাছে পানের বাটা তুলে দিল। যদি সম্রাটের হাতে তুলে দেন তো, রাজা ভাববেন, মেহমান হিসাবে ডেকে এনে অপমান! এ অবস্থায় পানদার সম্রাট আকবরের হাতে পানের বাটা তুলে দিয়ে বললেন : মহামহিম সম্রাট, আপনি নিজ হাতে আপনার মেহমানকে পানের বাটা তুলে দিয়ে সম্মানিত করুন। দুজনেই খুশি।বউ যদি আমার মাকে কষ্ট দেন?শিক্ষক : কারণটা খুঁজে বের করতে হবে এবং তোমাকেই সেটি বন্ধ করতে হবে। সংসারকে রাষ্ট্রের চেয়েও বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে। এখানে আবেগ নয, স্ববেগ প্রয়োগ করতে হবে। মাঝে মাঝে মা ও বউ উভয়কে নিয়ে বেড়াতে যাবে। গল্পচ্ছলে বউকে বুঝাতে হবে, একদিন তিনিও শাশুড়ী হবেন, মাকে বুঝাতে হবে একদিন তিনিও বউ ছিলেন। তবে সবক্ষেত্রে মা-কে বেশি মেনে নিতে হবে। তিনি মা, তার অভিজ্ঞতা বেশি।একজন শিক্ষার্থী বললেন : আমি অবশ্যই প্যাকেটটা মায়ের হাতে তুলে দেব।এতবড় প্যাকেট আপনার বৃদ্ধা মা রাখতে পারবেন না। মাটিতে পড়ে ভেঙে যাবে। মাকে দিয়ে হচ্ছে না বলেই তো বিয়ে করেছ, নাকি? মাকে যদি কেউ সংসার জীবনের জন্য যথেষ্ট মনে করেন এবং বউ এলে মা অত্যচারিত হবে ভাবেন, তাদের বিয়ে না-করাই উত্তম। অন্তত মা গত হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধরা উচিত|
আফ্রিকান এক শিক্ষার্থী বলল : কে বড়, মা না বউ?
শিক্ষক : জন্ম তারিখ দেখেই তো তা বোঝা যায়।
না, মানে বলতে চাইছি মায়ের গুরুত্ব বেশি নাকি বউয়ের?
শিক্ষক : শ্বাসনালীর গুরুত্ব বেশি নাকি ফুসফুসের? কলিজার নাকি হৃদপিণ্ডের? মুরগির নাকি ডিমের?
একটি ছাড়া অন্যটি অর্থহীন।

এটাই আসল কথা। বোন আর বোনের স্বামীর মধ্যে যেরূপ মধুর সম্পর্ক তুমি আশা কর, তোমার আর তোমার স্ত্রীর সম্পর্ক কমপক্ষে ততটুক মধুর হওয়া উচিত। প্রত্যেক মায়ের উচিত তার পুত্রবধূর সঙ্গে এমন আচরণ করা, যা তিনি তার কন্যার জন্য কন্যার শাশুড়ি হতে আশা করেন। 

Sunday, 24 January 2016

নিকৃষ্ট জাতির বৈশিষ্ট ; ড, মোহাম্মদ আমীন

নিকৃষ্ট জাতির বৈশিষ্ট্য

---------------------------------------------------------------------পৃথিবীর অতি নিকৃষ্ট জাতির কিছু বৈশিষ্ট্য প্রদান করা হলো। আপনার জানা থাকলে আরও কিছু বৈশিষ্ট্য দিন এবং যদি আপনি অকুতোভয় হোন তো বলুন, পৃথিবীর এক বা একাধিক অথবা অন্তত একটি নিকৃষ্ঠ জাতির নাম বলুন।
নিকৃষ্ট জাতির বৈশিষ্ট্য : 
১. অতি সংখ্যাগুরু হয়েও সংখ্যালঘু জাতির পদানত থাকতে বাধ্য হয়। তারা কেবল মাথা গণনা করে কিন্তু মাথার মগজ নিয়ে ভাবে না। ফলে, মাথাগুলো মৃত খুলির মতো ভয়ঙ্কর ভৌতিকতায় কেবল জন্ম দেয়। অজ্ঞতা ও সামর্থ্যহীনতার জন্য তারা কোনো প্রতিবাদ করতে পারে না। তারা সাহসী নয়, পাশব; এর ভীরু এবং প্রচণ্ড লোভী। সামান্য অর্থের জন্য বিশ্বাসঘাতকতা করতে কুণ্ঠিত হয় না। 
২. কুসংস্কার, পৌরাণিক কাহিনি, অলৌকিকতা, পশ্চাদপদতা ও একগ্রন্থমুখীনতায় কঠিনভাবে আবদ্ধ থাকার কারণে পরিবর্তনকে পাপ মনে করে। পরিবর্তন এদের কাছে ভয়ঙ্কর, এরা কেবল অতীত আঁকড়ে ধরতে চায়। মনে করে অতীতের সবকিছু ভালো, বর্তমান জঘন্য। অতীত আকড়ে থাকে বলে আধুনিকতা তাদেরকে চরম অবহেলা করে। তাদের ভবিষ্যৎ ক্রমশ অতীতের বাস্তবতা বিবর্জিত বিশ্বাস দ্বারা ছেয়ে থাকে। ফলে, তারা আধুনিক যানের সঙ্গে ঠেলাগাড়ি নিয়ে অসম প্রতিযোগিতার শিকারে বার বার পরাজিত হতে থাকে। এমন জাতির বুদ্ধিজীবীরা মিথ আর বিজ্ঞান, কল্পকাহিনি আর জ্ঞানকে মিশিয়ে পুরো জাতিকে উদ্ভট করে দেয়।
৩. সর্বজনীনতা না-থাকায় তারা নিজ জাতি ছাড়া অন্য সবাইকে প্রচণ্ড ঘৃণা করে,  তারা ভালবেসে টেনে নিতে জানে না তবে গ্রাস করে নিতে উদগ্রীব থাকে। কিন্তু সামর্থ্যহীনতার কারণে তা-ও পারে না। বরং নিজেরাই ধ্বংস হয়ে যায়, নিজেদের ভূমি হারিয়ে ফেলে।  নিজস্ব মতবাদ প্রচারের জন্য অনুসারীদেরকে জোড়ায় জোড়ায় কতল করার নির্দেশ দেয়। হিংস্রতা দেখাতে গিয়ে তারা নিজেরাই বিশ্বব্যাপী হিংস্রতার শিকারে পরিণত হয়। এদের একাধিক উপজাতি বা উপগোত্র রয়েছে এবং এক উপজাতি বা উপগোত্র অন্যকে ভূয়া বলে বাতিল ঘোষণা করে। একজন আর একজনকে বিশ্বাস করে না, বিশ্বাসঘাতকতা তাদের মজ্জাগত। 
৪. একান্ত অনুসারী ছাড়া অন্যদের চরম শত্রু ভাবে এবং ভিন্ন মতাবলম্বীদের চরম অকল্যাণ কামনা করে। অথচ নিজেদের মৌলিক চাহিদা ও প্রাত্যহিক জীবন পরিচালনা করার জন্য ভিন্ন মতাবলম্বীদের আবিষ্কারের দিকে তীর্থের কাকের মতো চেয়ে থাকে। অন্য ধর্মাবলম্বীকে পাপিষ্ঠ বলে গালি দেয় কিন্তু পাপিষ্ঠদের নির্মিত যন্ত্রে চড়ে পূণ্য অর্জনের জন্য তীর্থে যায়। 
৫. সংখ্যায় এর অগণিত, লাখে লাখে বেশুমার। তারপরও অন্য জাতির কেউ জাত বা ধর্ম ত্যাগ করে নিজেদের দলে যোগ দিলে সত্যমিথ্যা যাচাই না-করে কথিত সংবাদে উৎফুল্ল হয়ে উঠে। অথচ জানে না ঘটনাটা আদৌ সত্য কিনা। যোগদানকারী কি এবং কে- তাও বিবেচনা করে না। এদর কাছে সংখ্যাই মুখ্য, গুণের কোনো মূল্য নেই। এদের কাছে একজন রিক্সাওয়লা ও একজন পাইলট সমান। কায়িক শ্রমের উপর প্রচণ্ড নির্ভরশীল।
৬. সর্বক্ষণ অন্তর্কলহ ও পরচর্চায় নিয়োজিত থাকে। স্বার্থের জন্য নিজের ভাই, বন্ধু, অনুসারী এমনকি মা-বাবাকেও শেষ করে দিতে কুণ্ঠিত বোধ করে না। স্বার্থানুযায়ী মতবাদ প্রচার করে ও ব্যাখ্যা দেয়। নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রা ভঙ্গ করে। অন্য জাতির দুর্যোগে চরম আনন্দ পায় এবং বিপদ কামনা করে। আবার নিজেদের দুর্যোগে তাদেরই সহায়তায় বিপদমুক্তির জন্য ধর্ণা দেয়। 
৭. এরা মাতৃভাষার চেয়ে অন্য ভাষাকে অধিক পবিত্র মনে করে। পিতা-মাতার চেয়ে গুরু-ঠাকুরকে অধিক মর্যাদা দেয়। শিক্ষিত, জ্ঞানী ও প্রগতিশীল লোকদের সমালোচনা করে এবং তাদেরকে পাপিষ্ঠ ভাবে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা শোনালে পৌরানিক কাহিনির দোহাই দিয়ে জ্ঞানীদের কটাক্ষ করে। মিথ-পিরিত তাদের সকল অগ্রসর চিন্তাকে অন্ধের মতো কালো অন্ধকারে ঢেকে রাখে।
৮. তাদের কাজ আর কথার মধ্যে বিস্তর ফারাক লক্ষ করা যায়। তারা যা বলে তা করে না এবং যা করে তা বলে না। দিনের বেলা যা নিষিদ্ধ, রাতে তা দিব্যি আরামে উপভোগ করে যায়। সাধারণ জীবনযাপনকে পূণ্যময় মনে করলেও নিজেরা অত্যন্ত বিলাসী জীবন উপভোগ করে। 
১০. অপার্থিব ক্ষমতার মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন, শত্রু মোকাবেলা এবং সম্পদশালী হওয়ার চিন্তা করে। তাই প্রকৃতপক্ষে তারা সবাই দরিদ্র থেকে যায়- আজীবন এবং প্রগতিশীল জাতির মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়। 
১১. এরা শিক্ষায় পিছিয়ে আছে এবং আধুনিক শিক্ষাগ্রহণকে এখনও পাপ মনে করে। যারা শিক্ষিত হন, তাদেরকে পাপিষ্ঠ ও ঈশ্বরদ্রোহী গণ্য করে একঘরে করে দেয়। 
১২. বিজ্ঞানের সকল সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করলেও বিজ্ঞানকে ঘৃণা করে। বিজ্ঞানের অনেক কথা মেনে নিতে চায় না কিন্তু বিপদে পড়লে আশ্রয় নেয় বিজ্ঞানে। বলে, পৃথিবী গোলাকার নয়, সমতল। 
১৩. এরা শাক্ত। শক্তির পুজা করে কিন্তু নিজেরা শক্তিহীন। সবসময় আচার-আচরণে শক্তের ভক্ত, নরমের যম। মিথ্যা বলে বেশি, সত্য বলে কম। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সব আদর্শ ও বিশ্বাস বিসর্জন দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত বোধ করে না। অথচ প্রকৃত ক্ষমতা কখনও পায় না। এদের বিশ্বাস সর্বদা পার্থিব প্রাপ্তি ও সংকীর্ণ স্বার্থকে ঘিরে আবর্তিত হয়। শাক্ত বলে এর সাধারণ মানুষের শক্তি ও গণতন্ত্রকে প্রকৃত অর্থে প্রয়োগ করে না।
১৩. অনেক ক্ষেত্রে এদের ধর্ম ও সংস্কৃতি অভিন্ন থাকে না। এজন্য তারা ধর্ম ও সংস্কৃতি কোনোটাকে আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করতে পারে না। তারা জাতীয়তাবোধ, স্বকীয়তা, ব্যক্তিত্ব ও দেশপ্রেমের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ গুনাবলি  হতে অনেক পিছিয়ে থাকে। এজন্য সহজে, তারা অন্য জাতির পদানত হয়ে পড়ে। এদের কেবল বিশ্বাস আছে কিন্তু বিশ্বাসে আস্থা নেই। ইহকালের চেয়ে পরকাল অনেক আনন্দময় বিশ্বাস করলেও, কেউ সহজে পরকালের ওই আনন্দময় জগতে প্রবেশের জন্য মোটেও আগ্রহী থাকে না।
১৪. এরা বিবর্তনবাদে অবিশ্বাসী কিন্তু বিবর্তন হয়ে এতদূর যে এসেছে- এটা মোটেও মেনে নিতে চয় না। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম নিয়ে এত মগ্ন থাকে যে, সারাক্ষণ ধর্ম নিয়ে তর্কবিতর্ক করে। নিজের ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে অন্যকে আহত করে, হত করে। 
১৫. এদের কিছু সদস্য বিজ্ঞান পড়লেও বিজ্ঞানমনস্ক হয় না। কারণ এরা শুধু পার্থিব লোভ আর সহজে চাকরি পাওয়ার জন্য বিজ্ঞান পড়ে। জাতি বা গোষ্ঠী বা দেশের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা দেখা যায় না। প্রত্যেকে কেবল নিজের চিন্তা করে বলে, জাতি গঠন ও দেশনির্মাণে তাদের প্রকৃত অর্থে কোনো আন্তরিকাতা পরিলক্ষিত হয় না। 
১৬. এদের আনুগত্য, জাত্যাভিমান, দেশপ্রেম বা নেতৃত্ববোধ কেবল ব্যক্তিস্বার্থকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। নিজেদের নেতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন না-করে নেতার ক্ষমতা, সম্পত্তি ও সম্পদ ভাগাভাগির ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে এবং নেতার লাশ পচে গন্ধ বের না-হওয়া পর্যন্ত হুশ ফেরে না। 
১৭. এরা শিক্ষিত হলেও জ্ঞানী নয়, প্রকৃতি ও বাস্তবতা থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে না, জানে না। এরা মারাত্মক ধর্মবাজ, কুসংস্কাচ্ছান্ন, গোড়া, উগ্র জাতীয়তাবাদী, জীবনের সবক্ষেত্রে ধর্মকে টেনে নিয়ে আসে এবং ধর্মের দোহাই দিয়ে অশিক্ষিত সাধারণ মানুষকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করে। যারা প্রগতির কথা বলে,তাদের নির্যাতন করাকে পুণ্য মনে করে। 
১৮. এর ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতার চরম বিরোধী। যারা নতুন কিছু বলে বা নতুন কিছু করতে চায়, তাদেরকে স্বগোত্রীয় হলেও ক্ষমা করে না। এরা সবসময় সংস্কার বিরোধী এবং প্রবলভাবে অন্ধবিশ্বাসে আবদ্ধ। এদের রীতি-নীতি ও অনুভব মুক্তচিন্তা বা মুক্তবুদ্ধির প্রতিবন্ধক বলে কোনো সংস্কারককে মেনে নেয় না। এদের মতবাদ ভিত্তিহীন বলে কোনো সমালোচনা সহ্য করতে পারে না। ভয় পায়, যদি আলোচনা তাদের ভিত্তিহীন ভত্তিকে চুরামার করে দেয়!  
১৯. অজ্ঞ বলে এদের কাছে যুক্তির কোনো দাম নেই। যুক্তিবাদীদের মনে করে শত্রু। তাদের বিচার ও বিবেচনাবোধ একগ্রন্থমুখী নির্দেশনার আলোকে অর্ধশিক্ষিত ব্যক্তিদের ইচ্ছায় তাড়িত হয়। এখানে না থাকে বিজ্ঞান, না থাকে দর্শন, না থাকে কোনো সংস্কৃতি। ফলে একই ভাষা, একই ধর্ম এবং একই সংস্কৃতির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র গঠন করতে পারে না। বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে বলে সহজে শত্রুর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

Saturday, 23 January 2016

বরিশাল সদর উপজেলার নামকরণ / ড. মোহাম্মদ আমীন

বরিশাল সদর উপজেলা 
তেঁতুলিয়া, আড়িয়াল খাঁ, কচা ও কীর্তনখোলা নদী বিধৌতা বরিশাল সদর উপজেলার আয়তন আয়তন ৩০৭.৫৯ বর্গ কিলোমিটার এবং লোকষংখ্যা ৪,৬৯,৯৬০। ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দের এখানে থানা সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮ জানুয়ারি । বরিশাল সদর থানার নামকরণ সম্পর্কে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে। বরিশাল নামকরণ নিয়ে একাধিক প্রবাদ প্রচলিত আছে।বাকলা অঞ্চল লবণ উৎপাদন ও অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রীর ব্যবসার জন্য প্রাচীনকাল হতে বিখ্যাত ছিল।শুল্ক আদায়ের প্রধান চৌকি ছিল গিরদে বন্দর। গিরদে অর্থ একটি নির্দিষ্ট এলাকা। গিরদে ছিল বরিশালের প্রাচীন একটি নাম। এখানে লবণের বড় বড় গোলা ছিল। গিরদে ছিল দক্ষিণ বাংলার লবণ শুল্ক আদায়ের প্রধান চৌকি। ইউরোপীয় বণিকগণ গিরদে বন্দরকে বড়িশল্ট বলতে। অনেকে মনে করেন, বড়িশল্ট পরিবর্তিত হয়ে বরিশাল নাম ধারণ করে। আবার অনেকের মতে, এখানকার লবণের দানাগুলো বড় ছিল। তাই ইংরেজগণ এখানকার লবণকে বড়িশল্ট বলতেন। যা হতে বরিশাল নামের উৎপত্তি। কেউ কেউ বলেন, প্রাচীনকালে বরিশালে বড় বড় শাল বৃক্ষ ছিল। তাদের মতে বড়শাল বৃক্ষ হতে এলাকার নাম হয় বরিশাল। বরিশাল নামের আর একট কিংবদন্তি বেরি নামের এক পর্তুগিজ যুবক ও শেলি নামের এক পর্তুগিজ কন্যার নামের সাথে সম্পৃক্ত। বেরী নামের এ যুবক শেলীর প্রেমে পড়েন। কিন্তু প্রেমে ব্যর্থ হয়ে বেরি আত্মহত্যা করেন। এ ঘটনায় ‘বেরিশেলী’ যুগল নাম তখন লোকের মুখে মুখে। ‘বেরীশেলী’ই পরিবর্তিত হয়ে বরিশাল হয়। কারো কারো মতে, শঅল অর্থ গৃহ, বরিশালে বড় বড় গৃহ নির্মিত হয় বলে এর নাম বড়শাল বা বরিশাল। আলোচ্য এলাকাটি একসময় ঘন জঙ্গলে আচ্ছন্ন ছিল। জঙ্গল পরিষ্কার করে এ জনপদের পত্তন হয়। জঙ্গলে প্রচুর বাঘ ছিল। স্থানীয় লোকজনের কাছে বাঘ বড় শিয়াল নামে পরিচিত ছিল এবং এর আঞ্চলিক উচ্চারণ ছিল বশিয়াল। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ আঞ্চলিক ভাষার অভিধানে ‘বশিয়াল’ অর্থ বাঘ নির্দেশ করেছেন। কথিত হয়, এ বশিয়াল বা বড় শিয়াল থেকে বরিশাল নামের উদ্ভব। আবার অনেকের ধারণা, বুকরি চাল নামক এক প্রকার মোট জাতের চাল হতে বরিশাল নামের উদ্ভ। এক সময় আলোচ্য এলাকায় প্রচুর বুকরি চাল উৎপন্ন হতো। কথিত হয়, এ বুকরি চাল হতে বরিশাল নামের উদ্ভব। অন্য একটি প্রবাদমতে, বরিষার কাল বা বর্ষাকাল হতে বরিশাল নামের উদ্ভব।